দক্ষিণ পূর্ব

মাইশার মৃত্যু: একটি দুর্ঘটনা নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার পরিণতি?

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:২৫ সকাল
সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
পঠিত : ৩৩
মাইশার মৃত্যু: একটি দুর্ঘটনা নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার পরিণতি?

ছবি

Degchibarictg

মোঃ শাখাওয়াত সোহান 

একটি মৃত্যু, কয়েকটি পরিবারের কান্না আর একদল শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন—সীতাকুণ্ডের কুমিরায় শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে দেশের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র। একটি লরির ধাক্কায় একটি মিনিবাস উল্টে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এই শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন আরও দুই শিক্ষার্থী। কিন্তু ঘটনার পর শুধু চালকের ভুল খুঁজলেই কি সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে? নাকি এই প্রাণহানির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতি?

মঙ্গলবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরায় আইআইইউসির প্রধান ফটকের সামনে ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশে যাত্রী ওঠানামার জন্য একটি মিনিবাস দাঁড়িয়ে ছিল। এর পেছনে একটি প্রাইভেট কার এবং তার পেছনে ছিল দুটি ট্রেইলার।

ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সামনের দিকে যানবাহনের গতিবিধির পরিবর্তন ঘটলে একটি ট্রেইলার সংঘর্ষ এড়াতে বাম দিকে সরে যায়। এ সময় পেছনে থাকা আরেকটি ট্রেইলার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় মিনিবাসটি উল্টে গেলে এর নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান মাইশা। মুহূর্তের এই দুর্ঘটনা শেষ করে দেয় একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর জীবন।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সকালে ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন তিন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মাইশার মৃত্যু এবং অন্য দুজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।

দুর্ঘটনার দায় কি শুধু চালকের?

সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়গুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হলে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হয়। বিশেষ করে একই স্থানে একাধিক যানবাহনের অবস্থান, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, যাত্রী ওঠানামার স্থান এবং সড়কের ওপর পার্কিংয়ের বৈধতা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

কুমিরা ও কেডিএস ডিপোসংলগ্ন মহাসড়কে দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহন পার্কিং এবং যানজটের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ভাষ্য, মহাসড়কের দুই পাশে ট্রেইলার, লরি ও অন্যান্য ভারী যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হয়। এতে বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে চলতে পারে? শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা হয়নি? মহাসড়কের পাশে অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না কেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, আসলে জননিরাপত্তার দাবি

সহপাঠীর মৃত্যুর পর ছয় দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন আইআইইউসির শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনার মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ, মহাসড়কের দুই পাশের অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, সড়ক প্রশস্তকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দুই পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

এই দাবিগুলোকে নিছক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ চলাচল করেন। সেখানে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা মানে প্রতিনিয়ত নতুন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে রাখা।

ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তদন্তে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র

মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত দায় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। দুর্ঘটনায় জড়িত প্রতিটি যানবাহনের গতিবিধি, চালকদের ভূমিকা, যানবাহনের গতি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছিল কি না এবং মিনিবাসটি কোথায় ও কীভাবে দাঁড়িয়েছিল—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করতে হবে।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনাস্থলের সড়ক পরিস্থিতি, অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তদন্তের বাইরে রাখা যাবে না। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করা জরুরি।

শুধু একজন চালককে দায়ী করে তদন্ত শেষ করলে ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা ঠেকানোর পথ তৈরি হবে না। বরং যে পরিস্থিতি এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছে, সেটিও চিহ্নিত করতে হবে। দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন আলোচনা, প্রতিবাদ, আশ্বাস ও অভিযান চলে। এরপর অনেক ঘটনাই ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে যায় আগের মতোই। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মাইশার মতো আরও অনেক তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে যেতে পারে।

মাইশা আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরবেন না। তাঁর পরিবার ফিরে পাবে না প্রিয় সন্তানকে, সহপাঠীরা ফিরে পাবে না তাদের বন্ধুকে। এই অপূরণীয় ক্ষতির দায় কোনো আশ্বাস দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। মহাসড়কের অবৈধ পার্কিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে, ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

একটি দুর্ঘটনার পর দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন দায়বদ্ধতা ও বাস্তবসম্মত সমাধান। মাইশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে। কারণ একটি প্রাণ হারানোর পর শোক প্রকাশের চেয়ে সেই প্রাণহানি ঠেকানোর ব্যবস্থা করাই রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্ব।

আরএইচ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।