বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ।
ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশের সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিশ্বের চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থায়।
তিনি বলেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব চায়, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে।
জাতিসংঘকে সমঝোতাভিত্তিক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায় বাংলাদেশ—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই সংকটের সমাধান উল্লেখ করে এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাংলাদেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা, তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলায় গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরছেন।
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণরা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।