নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্যাম্পাস সংলগ্ন জোবরা গ্রামের স্থানীয়দের দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই। বংশপরম্পরায় গ্রামের অনেক মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা নির্ধারণ জটিলতা নিয়ে এ গ্রামের মানুষের সঙ্গে শুরু থেকেই দ্বন্দ্ব। যদিও এ এলাকার অনেক মানুষের একটি ‘স্বপ্ন’ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার। চাকরি আর ভেতরে দোকান বরাদ্দ পেতেও সবসময় এই এলাকার মানুষের চাপ থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর। তবে শিক্ষার্থীদের অনেকের বিরুদ্ধেও গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগানোর অভিযোগ আছে।
এক নম্বর গেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশের বাহন সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রতিনিয়ত ঝগড়া হয় শিক্ষার্থীদের। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক সরবরাহের সঙ্গেও জোবরা গ্রামের অনেক বাসিন্দা জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত এলাকার লোকজন। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পাশাপাশি ছাত্র খুনের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিল তারা। এ ছাড়া ছাত্র সংঘর্ষে বিভিন্ন গ্রুপকে অস্ত্র সরবরাহও করে জোবরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ক্যাডাররা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জোবরা গ্রামের লোকজন সবসময় শিক্ষার্থীদের প্রতি মারমুখী থাকে। তারা চাকরি, ব্যবসা ও আধিপত্য ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চাপে রাখা কৌশল হিসেবে সবসময় শিক্ষার্থীদেরও ঠুনকো অজুহাত পেলেই মারধর করে। গ্রামের লোকজন বলে থাকে, তাদের বাপ-দাদার জমিতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই তাদের কথা মেনে চলতে শিক্ষার্থীরা বাধ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা দখল
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার তিন পাশেই জোবরা গ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর না থাকার সুযোগ নিয়ে একরের পর একর জমি দখল করে নিয়েছিল এ এলাকার অসাধু প্রভাবশালী মহল। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এ সময় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এলএ শাখা ও হাটহাজারী সহকারী কমিশনার, ভূমি কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তখন অনেক দখলদারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ছেড়ে দিতে হয়। ওই সময় এলাকাবাসী বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করে। কিন্তু মামলার রায় হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ শুরু করে। এ প্রাচীর নির্মাণ করতে গেলে বিভিন্ন সময় জোবরা গ্রামের লোকজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু এরপরও প্রশাসন সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে।
২০১৯ সালে উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর জোবরার প্রভাবশালীরা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা এলাকার বেশকিছু জমি আবারো দখল করে। তাদের এ কাজে সহযোগিতা করে উপাচার্য শিরীন আখতারের পরিবারের কিছু সদস্য ও স্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার। এ কাজে বড় অঙ্কের লেনদেনও হয়। তবে জোবরার লোকজন সব জায়গা দখলে নিতে না পারায় এখনো বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের প্রতি ক্ষোভ প্রদর্শন করছে। বর্তমান প্রশাসনও গত এক বছরে বেদখল হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ও ভেঙে ফেলা সীমানাপ্রাচীর পুনঃনির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
চাকরি, দোকান বরাদ্দ পেতে শিক্ষার্থী পিটিয়ে চাপ তৈরি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হাটহাজারী উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের জোবরা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। এ গ্রামের লোকজনের জীবিকা নির্বাহের বড় একটি অংশের জোগান হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। প্রায় ৫০০ পরিবারের সদস্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিজীবী। কয়েকশ’ সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকের ঘরও জোবরা এলাকায়। এর বাইরে ভাসমান হকার, মুদি দোকানি, ফার্মেসি, কাপড়, ঝুপড়িসহ শতাধিক দোকানের মালিকও এলাকার বাসিন্দা। তবুও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য নানা অনৈতিক কাজে যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাধু চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোবরার লোকজন টাকা-পয়সা লেনদেন করে চাকরির জন্য। বিগত সময়ে চাকরি ও দোকান বরাদ্দের জন্য ছাত্রলীগ নেতাদের টাকা দিতো তারা। টাকার বিনিময়ে জোবরার লোকজনের চাকরি নিশ্চিত করতে ছাত্রলীগ বিভিন্ন সময় শাটল ট্রেন বন্ধ করে দেয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকেও তালা ঝুলাতো ছাত্রলীগ।
সংঘর্ষে অস্ত্রের জোগান দেয় জোবরা, মাদকের গোডাউনও এই গ্রাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একাধিক গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ বাধতো। এসব সংঘর্ষে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার হতো। ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের হাতে অস্ত্র তুলে দিতো জোবরা ও মদনহাট কেন্দ্রিক যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। জোবরা গ্রামের যুবলীগ নেতা হানিফ, মদনহাট এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুর আলম মঞ্জুসহ বেশ কয়েকজন নেতা ছাত্রলীগকে অস্ত্র সরবরাহ করতো। এসব অস্ত্র ব্যবহার হতো ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরে। ছাত্রলীগের ক্যাডাররা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে জোবরার আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘরে আটকে রেখে চাঁদার জন্য নির্যাতন চালাতো। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় হল ও কটেজে মাদকসেবী শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক সরবরাহ করতো জোবরার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রশাসন জোবরার মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারও করে।
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, খুন করে আধিপত্য বিস্তার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম জোবরা গ্রামের লোকজন ক্যাম্পাস এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। সন্ধ্যা নামলেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি দাবি করে এই চালকরা। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর চড়াও হয় তারা। বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবাদ করায় জোবরার লোকজনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের সংঘাত হয়। এমনকি তাদের হাতে খুনও হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। ২০১০ সালের ১৫ই এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আসাদুজ্জামানকে খুন করে জোবরা গ্রামের যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। গত বছরের ২১শে অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষার্থীদের ওপর যুবলীগের হানিফ বাহিনী হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশন এলাকায় তারা শিক্ষার্থীদের ওপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রেলগেট এলাকায় যায়। এ সময় এলাকাবাসীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়।
সর্বশেষ গত শনিবার রাতে জোবরা গ্রামের দুই নম্বর গেটে ভাড়া বাসায় প্রবেশের সময় দারোয়ানের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে মারধরের শিকার হন এক নারী শিক্ষার্থী। এর জেরে রোববার সারাদিন দফায় দফায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে চবি শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এতে আহত হন প্রো-ভিসি, প্রক্টর, গণমাধ্যমকর্মী। ঘটনা তদন্তে রোববার রাতে ২১ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাস জুড়ে টহলে রয়েছে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। আজ (মঙ্গলবার) রাত ১২ পর্যন্ত এটি বহাল থাকবে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ক্যাম্পাসসহ পুরো এলাকায়।
এদিকে বারবার এই সংঘাটের পেছনে শিক্ষার্থীদের অতি উৎসাহী আচরণকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা।শিক্ষার্থীরা ঠুনকো অজুহাতে ঝামেলা করেন বলে অভিযোগ তাদের।শনিবারের ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ লোকমান বলেন, ওই রাতে মেয়েটি বাসায় ফিরতে দেরি করায় দারোয়ান বকাঝকা করেছে হয়তো। তাই বলে ওই মেয়ে বন্ধু বান্ধব নিয়ে ওই বৃদ্ধ মানুষের উপর হামলা করতে পারে না।তারা সঅতি উৎসাহী হয়ে ওই দারোয়ানকে সেখান থেকে উঠিয়ে নিতে চেয়েছিলো।লোকটা যদি ভুল করে তার বিচার হতো।প্রক্টরিয়াল বডি ও এলাকার জনপ্রতিনিধি মিলে সেটার সমাধান করবে।আপনারা কারা যারা মানুষ উঠিয়ে আনতে যাবেন।
জোবরাবাসীর পক্ষ নিয়ে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেন,ছাত্ররা নাকি এখন থেকে স্থানীয়দের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিবেনা। তাহলে আপনারাও জোবরার বুকের উপর দিয়েও চবিতে প্রবেশ করিয়েন না।এলাকাবাসী কখনো চাইলে চবি আলাদা করতে পারবে না।চবি ও চাইলে এলাকাবাসীকে আলাদা করতে পারবেনা।দুটোই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আর ইট মারবেন, পাঠকেল খাবেন না সেটাও কিন্তু হয়না।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।