মোহাম্মদ মঈনুল আলম ছোটন
সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা প্রত্যেক রাষ্ট্র ও নাগরিকের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু হঠাৎ কোনো ভিড় উত্তেজিত হয়ে ওঠে, মানুষ নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং ভয়াবহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। এ ধরনের মব বা গোষ্ঠীগত অরাজকতার মূল কারণ হলো উস্কানীমূলক মন্তব্য ও গুজব। এক একটি ভুল শব্দ অনেক সময় আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
মানুষ আবেগপ্রবণ। ক্ষণিক আবেগ, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে জনতা সহজেই প্রভাবিত হয়। আর এই প্রভাবিত করার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হলো উস্কানি। যেমন - সামাজিক উস্কানি, রাজনৈতিক উস্কানি এবং ধর্মীয় উস্কানি। কিছু মানুষ সমাজে গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। রাজনৈতিক মাঠে ক্ষমতা দখল বা বিরোধীদের দূর্বল করতে রাজনৈতিক উস্কানি মূখ্য ভূমিকা পালন করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে পারস্পরিক ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি করে। একটি কথার শক্তি এতটাই প্রবল যে শান্তিপূর্ণ ভিড় মুহূর্তেই সহিংস মবে রূপ নেয়।
উস্কানীর কারণে সাম্প্রতিক আলোচিত কিছু ঘটনা
বিশ্ব ও বাংলাদেশে সামান্য গুজব বা উস্কানিমূলক বক্তব্যই দাঙ্গা ও সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে কিশোর হত্যা। আগস্টে কুমিল্লায় মাদ্রাসার শিক্ষককে নিয়ে গুজব ছড়িয়ে স্থানীয়দের হামলা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ঢাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবে ছাত্র আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপান্তরিত করে। উক্ত সহিংসতায় পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা অনেকেই আহত হন। এ ধরণের অহরহ ঘটনা সারাদেশে প্রতিনিয়ত চলছেই।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, উস্কানিমূলক মন্তব্য আজও কতটা ভয়াবহ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তিকে কতটা হুমকির মুখে ফেলে।
কেন মানুষ প্রভাবিত হয়
১. শিক্ষার অভাব ও সচেতনতার ঘাটতি। ২. গুজব যাচাই করার প্রবণতার অভাব। ৩. আবেগপ্রবণতা ও ভিড় মানসিকতা এবং ৪. রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস।
প্রতিরোধের পথ
উস্কানীমূলক বক্তব্যকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা ও উপজেলা ভিত্তিক সভা সেমিনারের আয়োজনে করে মানুষকে গুজব ও উস্কানির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের শান্তিপূর্ণ ভাষণ প্রদান ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নিতে হবে।
পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
শুধু রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, পারিবারিক সমস্যাতেও উস্কানিদাতাদের সক্রিয়তা দেখা যায়। ছোটখাটো কলহ বা ভুল বোঝাবুঝি থাকলে সমাজের কিছু দুষ্টচরিত্র সেখানে আগুন জ্বালায়। মহল্লা কমিটি, সামাজিক সংগঠন, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা বা মসজিদ কমিটি গঠনেও এদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অথচ রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার - সবখানেই শান্তিপ্রিয় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সত্যের চেয়ে মিথ্যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। মানুষ সহজেই মিথ্যা তথ্যকে বিশ্বাস করে, কিন্তু সত্য যাচাই করতে অনীহা প্রকাশ করে।
প্রতিটি মব সৃষ্টি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও বিশৃঙ্খলার পেছনে মূল কারণ হলো কিছু মানুষের অসচেতন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উস্কানীমূলক বক্তব্য এবং মন্তব্য। যদি এসব কথার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় এবং মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখানো যায়, তবে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক:
আহ্বায়ক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।
সাবেক সদস্য (দপ্তরের দায়িত্ব প্রাপ্ত),
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।