মাসুদ ফরহান অভি
নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সংগঠিত করতে জোরদার ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ছাত্রজীবনে ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। ছাত্রত্ব শেষ করেই হয়ে উঠেছেন শিক্ষা উদ্যোক্তা। একের পর এক গড়েছেন প্রতিষ্ঠান। স্কুল, কলেজ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তাও তিনি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যেমন ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে, তেমনি হাজারো মানুষের হয়েছে কর্মসংস্থান। পেশাজীবনে ছিলেন অধ্যাপনায়। আচরণে বিনয়ী, সদালাপী এই ব্যক্তিত্ব রাজনীতির মাঠেও পোড়খাওয়া। যুগের পর যুগ রাজপথে তিনি ছিলেন সংগ্রামী। বলছিলাম চট্টগ্রামের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক নুরুল আমিনের কথা।
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সহযোগী ছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের শিক্ষাখাতকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি গঠন করেন রিসার্চ ফর এডুকেশন এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাডেমি (জঊগঅ ট্রাস্ট) ও ঊজঅ ট্রাস্ট। এই প্লাটফর্ম থেকে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি রীমা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, চিটাগাং কলেজ অব এডুকেশন। এছাড়া তিনি সাভার ল্যাবরেটরি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি।
অধ্যক্ষ নুরুল আমিন চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজ, ডেভেলপমেন্ট ফর এডুকেশন, সোসাইটি এন্ড হেলথের নির্বাহী সদস্য, গভর্নিং বডি সদস্য এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের পেশাগত জীবনও কেটেছে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে। তিনি ঢাকার সাভার ল্যাবরেটরী কলেজ, চিটাগাং কলেজ অব এডুকেশন (বেসরকারি বি.এড কলেজ), চট্টগ্রাম ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পটিয়া এ জে চৌধুরী কলেজেরও শিক্ষক ছিলেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করা নুরুল আমিন ছাত্র রাজনীতিতেও ছিলেন দাপুটে। তিনি ১৯৭৮ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য হন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ এই সংগঠনের অবিভক্ত চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ শিবিরের অবিভক্ত ঢাকা মহানগর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪-১৯৮৫ সালে তিনি শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য এবং চট্টগ্রাম মহানগরের সেক্রেটারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি জামায়াতের শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারশনের ঢাকা মহানগর সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের এই সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ নুরুল আমিন বলেন, স্কুল জীবন থেকেই আমি রাজনীতি সচেতন ছিলাম। শিক্ষা ক্ষেত্রে অবহেলিত জনপদের মানুষকে দেখে সবসময় আমার মন খারাপ থাকতো। মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন ও একটি আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমার স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতিতে অংশ নেওয়া। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে-সংগ্রামে তিনি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় আমাদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুযোগ হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় আমি গুরুতর আহত হয়েছিলাম। ঘটনাস্থলে তৎকালীন বায়তুশ শরফের পীর মুহতারাম আবদুল জব্বার সাহেবের পুত্র হাফেজ আবদুর রহিম ও স্কুল ছাত্র আমীর হোসেন শাহাদাত বরণ করেন।
ছাত্রজীবনে সোনালী সময়গুলোর কথা স্মরণে এনে অধ্যক্ষ নুরুল আমিন দক্ষিণপূর্বকে বলেন, দেশে যখনই কোনো বিপর্যয় এসেছে তখন ছাত্রশিবির ও জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে আমাদের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে। ১৯৮৫ সালে সন্দ্বীপের উরির চরে ও সন্দ্বীপে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় রিলিফ টিমসহ সাইক্লোন উত্তর ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনার সুযোগ হয় আমার। ১৯৮৮ সালে ঢাকার উত্তরা, কেরানীগঞ্জ, বাসাবো, রূপগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় আমরা ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা করি।
১৯৯১ এর এপ্রিলে সাইক্লোন ও গোর্কির পর পতেঙ্গা, হালিশহর, আনোয়ারায় বেওয়ারিশ লাশ দাফন, ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা ও গৃহ নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা করি আমরা। ২০২২ সালে সিলেটের বন্যাকবলিত এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে রিলিফ টিম গিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত থাকার সুযোগ হয় আমার। ২০২৪ সালে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর আমীর শাহজাহান চৌধুরীসহ আমি বন্যায় ফেনী, ছাগলনাইয়া, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। ২০২৪ সালে ফটিকছড়ির বন্যাকবলিত এলাকায় আমার নেতৃত্বে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা হয়। তিনি আরও বলেন, ফটিকছড়িতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়ায় ঘর নির্মাণে আমরা সহযোগিতা করেছি। দূর্ঘটনায় আহত-নিহতদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। জুলাই-২৪ আন্দোলনে চট্টগ্রামে আহতদের চিকিৎসা সহযোগিতা টিমের প্রধান হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছি।
অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নুরুল আমিন ফটিকছড়ি উপজেলার দক্ষিণ পাইন্দং সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মফজল আহমদ কৃষি নির্ভর ব্যবসায়ী হিসেবে সমাদৃত। তাঁর ভাই মোহাম্মদ নুরুল বশর নবীও একজন সমাজকর্মী। ফটিকছড়ি করোনেশন হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বেও সাথে এসএসসি পাশ করে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে। এরপর তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে। এ বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইন এডুকেশন ডিগ্রিও অর্জন করেন। শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক অধ্যক্ষ নুরুল আমিনকে চট্টগ্রাম-২ (ফটিছড়ি) আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ।
অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের স্ত্রীও প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। তাঁর স্ত্রী জোবাইদা নাসরিন বিসিএস (শিক্ষা) হিসেবে চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রফেসর ছিলেন। অধ্যক্ষ নুরুল আমিনের দুই কন্যার মধ্যে প্রকৌশলী মারজানা মাহদিয়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বিএসসি ও এমএসসি সম্পন্ন করে বুয়েটের এই বিভাগেই প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন। ছোট মেয়ে জুমানা আমানী একজন চিকিৎসক। তিনি এমবিবিএস, এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করে বিসিএস ক্যাডার (স্বাস্থ্য) হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ইনডোর মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত আছেন। তাঁর স্বামী রেজাউল করিম সিকদারও এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে বিসিএস ক্যাডার (স্বাস্থ্য) হিসেবে যোগদান করে।
রহা
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।