দক্ষিণ পূর্ব

ইসকনের টাকায় সিঙ্গাপুর বেড়ান বিপিসি’র জিএম, বিদেশে সম্পদের খোঁজে দুদক

RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৫
পঠিত :
ইসকনের টাকায় সিঙ্গাপুর বেড়ান বিপিসি’র জিএম, বিদেশে সম্পদের খোঁজে দুদক
নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিতর্কিত ধর্মীয় সংগঠন ইসকনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণি লাল দাশের বিরুদ্ধে। ইসকনের টাকায় তিনি ভ্রমণ করেছেন সিঙ্গাপুর। এ জন্য তাকে ছুটিও দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুুদক) তদন্তে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্যও উঠে আসে। ইসকনের বহিষ্কৃত নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর সাথে বিশেষ সখ্যতা থাকা বিতর্কিত এই কর্মকর্তা বিপিসিতে এখনো আছেন বহাল তবিয়তে।

২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের প্রশাসন-১ শাখার অফিস আদেশে বিপিসি’র মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণি লাল দাশকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়। এতে বলা হয়, মণি লাল দাশকে সিঙ্গাপুরস্থ ইসকন টেম্পল পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে ১১-১৪ জানুয়ারি-২০১৯ তারিখ পর্যন্ত অথবা প্রকৃত যাত্রার তারিখ হতে চারদিন অর্জিত ছুটি মঞ্জুরপূর্বক স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ সিঙ্গাপুর গমন ও অবস্থানের সরকারি অনুমোদন জ্ঞাপন করা হলো। এই অফিস আদেশের শর্তাবলিগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়, বর্ণিত সফরের ব্যয় ইসকন টেম্পল, চট্টগ্রাম ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় হতে নির্বাহ করা হবে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ থাকবে না। 

এদিকে বিপিসি’র মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণি লাল দাশের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মণি লাল দাশের বিদেশেও কোনো সম্পদ আছে কি-না তা জানতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠিও দিয়েছিলো সংস্থাটি।
জানা গেছে, মণি লাল দাশ ১৯৯৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক (এমআইএস) হিসেবে বিপিসিতে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন)। এর আগে সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিডেটের (এসএওসিএল) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়ার পর ২০ সালে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মণিলাল দাশের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দীর্ঘ অনুসন্ধানে মণিলাল দাশ ও তার স্ত্রী সেপিকা দাশের নামে আড়াই কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক প্রমাণ পায় সংস্থাটি। এই দম্পতির নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মণি লাল দাশের দায় বাদে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায় ৩ কোটি ২৩ লাখ ১৩ হাজার ৮০৪ টাকা। পাশাপাশি তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় হয় ৯৪ লাখ ১০ হাজার ৪০৩ টাকা। সবমিলিয়ে তার ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৭ হাজার ২০৭ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এর বিপরীতে তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ৯২ হাজার ১৯৩ টাকা। বাকি ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ১৪ টাকার সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ অর্জন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে।

আবার মণি লাল দাশের স্ত্রী সেপিকা দাশের পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়সহ তার মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ পাওয়া যায় ২ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২৭ টাকার। এর বিপরীতে তার গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় মাত্র ৫৭ লাখ ৪৪ হাজার ৬৭২ টাকা। এই কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল করেছে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ। প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখের পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী দুইজনের সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়। মণি লাল দাশের বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিএফআইইউকে চিঠি দিয়েছিলাম। এখন তার ফাইলটি দুদক-২ কার্যালয়ে আছে। দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২ এর উপ পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, মণি লালের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান আছে। তবে আমি এখানে নতুন এসেছি। তাই আপডেট কিছু বলতে পারছিনা। 

এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিপিসি মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মণি লাল দাশের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। জানা গেছে, মণি লাল দাশ নগরের কৈবল্যধাম মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে কৈবল্যধামের মোহন্ত মহারাজ কালীপদ ভট্টাচার্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তাঁর সহকারী রতন আচার্য সাড়া দেন। তিনি বলেন, মহারাজ চিকিৎসার কাজে ভারতে অবস্থান করছেন। রতন আচার্য বিপিসির মনি লাল দাশের সম্পর্কে বলেন, ‘মণি লাল দাশ আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। তঁাঁর কাজ-কর্ম সম্পর্কে কৈবল্যধামের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আমাদের একজন ভক্ত।’ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।