নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় এখনও উত্তপ্ত চট্টগ্রামের রাউজান।পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।টহল দিচ্ছে র্যাব ও সেনাবাহিনী।সংঘর্ষের জেরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরীর পদ স্থগিত করা হয়েছে।বিবাদমান পক্ষের গোলাম আকবর খোন্দকারের নেতৃত্বাধীন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বাতিল করা হয়েছে।গিয়াস কাদেরের অনুসারী বলে পরিচিত উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক নুরুল আমিন চেয়ারম্যানসহ মিরসরাই বিএনপি -যুবদলের ৫ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।তবে ২৪ ঘণ্টা পরও মামলা করেনি কোনো পক্ষ। সংঘর্ষে জড়িত কাউকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।
সংঘর্ষের পরপর রাতেই দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দলীয় সব পদ স্থগিত করা হয়েছে।চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। অতি শিগগিরই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হবে।
আরেক চিঠিতে বলা হয়, গিয়াস কাদের চৌধুরী সম্প্রতি নিজ এলাকায় দলের অভ্যন্তরে হামলাসহ সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছেন। একাধিকবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি উসকানিমূলক ভূমিকা রেখে এলাকায় অরাজক রাজনীতি চালিয়ে গেছেন। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হওয়ায় গঠনতান্ত্রিক বিধান অনুসারে প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ স্থগিত করা হয়েছে।চিঠিটি দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব ও ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিনের কাছে অনুলিপি আকারে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া আরেক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের ভেতরে সংঘাত ও হানাহানি সৃষ্টি করে দলীয় শৃঙ্খলা চরমভাবে লঙ্ঘন করায় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন চেয়ারম্যান, মীরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব গাজী নিজাম উদ্দিন, বারৈয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম মিয়াজী, যুবদল নেতা সিরাজুল ইসলাম ও কামাল উদ্দিনকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এরআগে মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) বিকেল ৪টার দিকে রাউজান পৌরসভার ছত্তারহাট এলাকায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির আহবায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার গ্রুপ সংঘর্ষে জড়ায়।এতে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়।সংঘর্ষের সময় গোলাম আকবর খোন্দকারকেও মারধর করা হয়।সংঘর্ষের সময় খোন্দকারের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নেতাকর্মীদের বহর নিয়ে উপজেলা বিএনপির প্রয়াত সভাপতির কবর জিয়ারত করতে যান গোলাম আকবর খন্দকার। এদিন আগামী ৯ আগস্ট সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার কর্মসূচি ছিল গিয়াস উদ্দিন কাদেরের অনুসারীদের। গোলাম আকবর তার বহর নিয়ে সত্তারহাট এলাকায় পৌঁছালে সেখানে অবস্থান নেওয়া গিয়াস উদ্দিন কাদেরের অনুসারীদের মুখোমুখি হন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। ঘটনার পরপরই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেখানে পুলিশ এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনাস্থলের কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গোলাম আকবর খোন্দকারের গলায় কাটা দাগ, রক্ত ঝরছে। নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পাজেরো জিপ ভাঙচুরে চুরমার হয়ে গেছে। সড়কে পড়ে আছে পুড়িয়ে দেওয়া কয়েকটি মোটরসাইকেল।
এদিকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন চেয়ারম্যানসহ মিরসরাইয়ে বিএনপি ও যুবদলের পাঁচ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। বুধবার (৩০ জুলাই) সকালে বারইয়ারহাট পৌরসদরে এবং দুপুরে মিরসরাই উপজেলা সদরে মিছিল শেষে মিরসরাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে সমাবেশ করেন বহিষ্কার হওয়া নেতাদের অনুসারীরা। এসময় তারা অভিযোগ করেন, বহিষ্কারাদেশ ‘একতরফা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ এবং এতে ত্যাগী নেতাদের রাজনৈতিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না এবং তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্যে আঘাত হানবে।
জানা যায়, আগামী ৯ আগস্ট রাউজানে জুলাই শহীদদের স্মরণে রাউজান কলেজ মাঠে বিএনপির কর্মসূচি রয়েছে। এই কর্মসূচির আয়োজনে রয়েছে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। গতকালের ঘটনার পর গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী সমর্থিতরা ৯ আগস্ট কর্মসূতিতে হামলার আশঙ্কা করছে। এছাড়া পুরো উপজেলায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে বিকেলে নগরের নাসিমন ভবনে উত্তর জেলা বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে রাউজান উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সদ্য বিলুপ্ত নেতারা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা, যার উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যা করা।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম জানান, উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি কেন্দ্র থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যেন দলীয় শৃঙ্খলা বজায় থাকে। আর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।
এ বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বিএনপির দুই পক্ষের হামলা সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো পক্ষ মামলা করেনি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। মামলা করলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
উল্লেখ্য, গোলাম আকবর খোন্দকার এবং গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাড়ি রাউজান উপজেলায়। উভয়ে রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য। রাউজানে বিএনপির নেতাকর্মীরা এ দুই নেতার আলাদা বলয়ে বিভক্ত। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রাউজানে উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে গণমাধ্যমের ভাষ্য।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।