বিশেষ প্রতিনিধি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদ্য সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে গত ২৮ ফেব্রুয়ারী জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে।এই দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সচিব মনোনীত হন চট্টগ্রামের মেয়ে নাহিদা সারোয়ার নিভা ।তাঁর মা, ভাই, বোন সকলেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পদধারী নেতা। আর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এমন পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে চলছে আলোচনা- সমালোচনা।
জানা গেছে, নাহিদা সারোয়ার নিভার বাড়ি ফটিকছড়ি। কিন্তু বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকাতেই জন্ম তার। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার হাতেখড়িও এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তাঁর বড় ভাই দিয়াজ ইরফান চৌধুরী ছিলেন সাইফুর রহমান সোহাগ ও এসএম জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক। দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শতাধিক শিক্ষার্থীকে শিবির ট্যাগ দিয়ে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেওয়ার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, শাহ আমানত হল ও জিরোপয়েন্টে তিন ছাত্র খুনে সরাসরি ছিলেন দিয়াজ ও তার ক্যাডাররা।
ক্যাম্পাসে টেন্ডারবাজ হিসেবে দিয়াজ ও তার অনুসারীরা ছিলেন সবসময় সমালোচিত। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার বাসা থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় কলা অনুষদের ৭৫ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগাভাগির কোন্দল ঘিরে ছাত্রলীগেরই প্রতিপক্ষ দিয়াজকে হত্যা করে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ হয়ে আসছে৷
নিভার আরেক ভাই মিরাজ ইরফান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা। ছাত্রলীগ কোটায় বাগিয়ে নিয়েছিলেন ডাকসুর পদও। বড় বোন জোবায়দা সারোয়ার নিপা। একসময় আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম নগর সাধারণ সম্পাদক আজম নাসিরের অনুসারী হলেও পরে নানা হিসেবনিকেশ করে দেশের ইতিহাসে সবচাইতে বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের 'নৌকা' উঠে রাজনীতি করেছেন তিনি চট্টগ্রামে। উত্তর জেলা যুব মহিলা লীগের যুগ্ম আহবায়ক পদ মিলেছিল তার নওফেলের বদান্যতায়।
আওয়ামীপন্থী আইনজীবী প্যানেল থেকে বড় বোন জোবায়দা সারোয়ার নিপা হয়েছিলেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির ক্রীড়া সম্পাদক। মা জাহেদা আমিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কৃষক লীগের কমিটির সদস্য। জাহেদা আমিনের ভাই, নিভার মামা রাশেদ বিন আমিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি। জাহেদা আমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের আমলে অসংখ্য কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মা, ভাই ও বোনের অপকর্মের বিরুদ্ধে নাহিদা সারোয়ার নিভাকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি কখনো। আওয়ামী লীগ সরকারের শতভাগ সুবিধাভোগী ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপকর্মে লিপ্ত থাকা একটি পরিবারের সদস্যকে এনসিপি তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে কেন মনোনয়ন দিয়ে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সিনিয়র সহ সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন,কয়েকটি পক্ষ বিপ্লবের স্পিরিটকে পুঁজি করে রাজনৈতিক উচ্চ বিলাসী হয়ে উঠেছে।এরমধ্যে তারা ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে।তাঁর প্রমাণ হচ্ছে সেই সময়ের দুর্ধর্ষ ক্যাডার দিয়াজের বোনকে নতুন একটি দলের শীর্ষ পদে নিয়ে আসা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন,ওই মেয়ে সম্পর্কে আমার তেমন জানাশোনা নেই।তবে তাদের পরিবারের ইতিহাস এই বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট লোকজনের কাছ থেকে আপনি নিজেও খোঁজ নিতে পারেন।আর আমার মনে হচ্ছে,খুব সুকৌশলে বিপ্লবের নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র জনতার দলে পতিত ফ্যাসিবাদের কিছু এজেন্ট ঢুকে যাচ্ছে।এই বিষয়ে দায়িত্বশীলদেকে সতর্ক হওয়া জরুরী।
এদিকে নিভার পক্ষেও নিয়েছেন নেটিজেনদের অনেকে।তাদের বক্তব্য, বাবা -মা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের কর্মের ফল কেন তাকে নিতে হবে।তাদের একজন দৈনিক প্রথম আলোর সাবেক প্রতিবেদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সেক্রেটারি তাসনিম হাসান।নিভাকে নিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে এটি ভাইরাল হয়েছে।
সেই স্ট্যাটাসের একটি অংশে তাসনিম হাসান লিখেছেন,'গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ পাওয়া নাহিদা সারওয়ার নিভাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ফেসবুকে। তবে খোঁজ নিয়ে জানলাম, পরিবারের আওয়ামী লীগ ঘরানার বাইরে গিয়ে নিভার নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তায় বেড়ে ওঠার শুরুটা আরও বহু বছর আগে। পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা নিয়ে ‘বিরক্ত’ নিভা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা মায়ের বাসায়ও আসছেন না।'
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাহিদা সারোয়ার নিভাকে কয়েক দফা ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।পরবর্তীতে বিস্তারিত লিখে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দেয়া হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।