ওমর ফারক মাসুম
জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল হিসাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায় দলটি।সেই স্বপ্নে চট্টগ্রামের ‘রাজনীতিবিমুখ’ শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের মনেও এক নতুন আশার জন্ম দেয়। এরপর পেরিয়ে গেছে সাত মাস। কিন্তু চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক জেলায় তেমন কোন কার্যক্রম নেই দলটির।এনিয়ে দলটির সমর্থক ও সুধীদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় মাঠের কর্মীদের অনেকে এখনও নিজেদেরকে ‘সংগঠক’ পরিচয় দিয়ে থাকেন।
গত ২০ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর দুই নং গেইট এলাকায় শোভাযাত্রা করে এনসিপি। এতে অংশ নেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রামের নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা দল গুছানো নিয়ে চট্টগ্রামে সক্রিয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন, কথা বলবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এতে হতাশ হন দলের পদ-পদবি পেতে আগ্রহী নেতাকর্মীরা। এরমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন বিতর্কে।এছাড়া কেন্দ্রের সাথে চট্টগ্রামের সংগঠকদের তেমন সমন্বয় নেই বলেও জানিয়েছেন কয়েকটি সূত্র।
জানা যায়, দলটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চেক প্রতারণা, মামলা-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নেতাদের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে। দলটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা পরিবর্তনের রাজনীতির কথা বলে মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি।তবে কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডে তা হোঁচট খাচ্ছে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপি নেতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা বিরোধ।সূত্র জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে থাকা সমন্বয়কদের মধ্যে বিভক্তি ও বিরোধ শুরু থেকে ছিল। এই সমন্বয়করা পরে এনসিপির নেতৃত্বে এসেছেন। নেতাদের পুরোনো বিরোধ এনসিপিতেও প্রভাব ফেলছে। ফলে কমিটি গঠন নিয়ে বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এনসিপি চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের বেশকিছু বিষয়ে মতপার্থক্য ও বিরোধ দেখা দিয়েছে। যার কারণে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে কোনো আসনেই এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি এনসিপি। তবে, যারা নির্বাচন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তাদের নাম তালিকাবদ্ধ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,প্রেস কনফারেন্স, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া ছাড়া তেমন কোন কর্মসূচি নেই দলটির।এছাড়া গুটিকয়েক নেতাকর্মী নিয়ে কয়েকটি মানববন্ধন করেছে তারা।যে কারণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকার পরও দলটি গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, দলীয় স্বার্থে রাজনীতির মাঠে জুলাই-আগস্টের স্পিরিটকে বিক্রি করছে এনসিপি। তারা আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিত্ব করতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে সম্মান দেখাতে হবে।
এদিকে একাধিক সূত্র বলছে, অন্য বড় দলের মতোই মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ - তিন ভাগে ভাগ করে চট্টগ্রামকে তিনটি সাংগঠনিক জেলায় ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপির নীতিনির্ধারকরা।এই কমিটি গঠনে কাজ করছেন ৩২ সদস্যের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সমন্বয় কমিটি। এতে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মীর আরশাদুল হক বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশে আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে চেষ্টা করছি সংগঠনকে একটি শক্তিশালী কমিটি উপহার দিতে, যেখানে ত্যাগী ও দলের জন্য নিবেদিতদের মূল্যায়ন করা হবে। আর যাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী অভিযোগ আসছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগের বাস্তবতা খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ প্রোপাগান্ডা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের সকল সহযোদ্ধাদের সকল সমলোচনাকে আমরা সাদরে গ্রহণ করে নিজেদের সংশোধন করছি। একইসাথে দলকে সুসংগঠিত করতে চট্টলার প্রতিটি ঘরে আমরা পৌঁছাতে কাজ করছি। আর সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এমন প্রার্থীদের বের করে আনতে আগ্রহীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছি। তা যাছাই-বাছাই করে কেন্দ্রের কাছে পাঠাচ্ছি। বাকি সিদ্ধান্ত নিবে কেন্দ্রীয় সংগঠন।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।