নিজস্ব প্রতিবেদক
সরওয়ার হোসেন বাবলা, চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী।গত এক বছরে তাকে বেশ কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করেছে প্রতিপক্ষ। প্রতিবারই অল্পের জন্য বেঁচে যান সে।তবে এবার শেষ রক্ষা হয়নি ।একেবারে কাছ থেকেই ঘাতকের বুলেট ঝাঝরা করে দেয় তার বুক।তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ছিল ১৮টি।
গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন সরওয়ার। এরপর জামিনে মুক্ত হয়ে টুম্পা নামের এক তরুণীর সঙ্গে চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বসেন বিয়ের পিঁড়িতে। কিন্তু মাত্র ৪৬ দিনের মাথায় প্রকাশ্যেই নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে খুন করা হয় সরওয়ারকে।
সরজমিনে দেখা যায়, সরওয়ার বাবলার লাশ পরে ছিল তানিয়া স্টোর নামে একটি দোকানের সামনে যেখানে তার বিশাল এক ব্যানার ঝুলে আছে। সেই ব্যানারের নিচেই পরে ছিল সরওয়ারের লাশ। এর কয়েক গজ সামনের সরওয়ার বাবলার বাড়ি। তার বাবা আব্দুল কাদের দাঁড়িয়ে ছিল ঘটনাস্থল থেকে হাত দশেক সামনে। এসময় লোকজনের মুখে আতঙ্ক। ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইতেই সরে যাচ্ছিলেন তারা।
তানিয়া স্টোরের পাশে একটি ফার্মেসির সামনে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে পাওয়া গেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি তানিয়া স্টোরের পাশে চায়ের দোকানে বসেছিলেন। মাগরিবের নামাজ শেষে এরশাদ উল্লাহ গণসংযোগ করতে করতে তানিয়া স্টোরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁকে ঘিরে মানুষের ভিড় ছিল। সেখানে সরওয়ার হোসেন বাবলাও ছিলেন। হঠাৎ গুলির শব্দ পান। প্রথমে ভেবেছিলেন ফটকা ফাটানো হচ্ছে। তিনি দোকান থেকে বের হয়ে দেখেন, লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সটকে পড়ছিলেন। কয়েকজন যুবককে দৌড়ে পশ্চিম দিকে পালিয়ে যেতে দেখেন। তানিয়া স্টোরের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়েছিলেন বাবলা। লোকজন এরশাদ উল্লাহকে ধরাধরি করে নিয়ে যান। পরে এলাকার এক ব্যক্তি বাবলাকে রিকশায় তুলে দেন। মোড়ে গিয়ে রিকশা থেকে পড়ে যান তিনি। তাঁকে লোকজন আবার তুলে দেন রিকশায়। তাঁর ধারণা, ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন বাবলা। তবে খুনিরা এরশাদ উল্লাহকে ঘিরে থাকা ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন।
জানা যায়, গত এক বছরে কয়েক দফা সরওয়ার বাবলাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা বাবলার বাড়ি থেকে বৈঠক করে ফিরছিলেন। চলতি বছরের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকার ঘিরে গুলি করে বাবলাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেদিন গাড়িতে থাকা বাবলার দুই সহযোগী মারা গেলেও ভাগ্য চক্রে বেঁচে যায় সরওয়ার বাবলা। এরপর গত ২৫ মে সরওয়ার বাবলার আরেক অনুসারী ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয় পতেঙ্গা এলাকায়। গত ৩ অক্টোবর রাতে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা দখলে নিতে ইয়াছিন গ্রুপের সঙ্গে রোকন-গফুর ও সরওয়ার বাবলার বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ব্যাপক গোলাগুলির হয়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর একজন মারা যান। এছাড়া উভয় গ্রুপের আরও অন্তত ১৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়। ওই সংঘর্ষে সরওয়ার বাবলাকে ভাড়া নিয়ে গেছে রোকন মেম্বার। ওইদিনও বাবলাকে মেরে ফেলার জন্য চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়, তবে ভাগ্যক্রমে ওইদিন বেঁচে ফিরে আসে বাবলা।
জানা যায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাজ্জাদ ও বাবলা বাহিনী গত দেড় বছরে খুন করেছে ছয়জনকে। একে অপরকে খুন করতে আরও আগে ছকও এঁকেছে কয়েক দফা। নগরীর অলিগলিতে একের পর এক হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন বাবলা, মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছেন বারবার। কিন্তু ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকতেই টার্গেট কিলিংয়ের শিকার করে বাবলাকে।
গত কয়েক মাসে একাধিক সাক্ষাৎকারে সরওয়ার হোসেন বাবলা নিজেও দাবি করেছিলেন, ছোট সাজ্জাদ ও তার ছেলেরা তাকে খুন করার চেষ্টা করছে। তিনি ফেসবুকে সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্নার হুমকির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘চন্দনপুরায় আমাকে মারতে গিয়ে জোড়া খুন করেছে ওরা।’
সরওয়ার বাবলার বাবা কাদেরের দাবি, ব্যবসার দখল নিতে তার ছেলেকে খুন করা হয়েছে। তার ভাষ্য, সরওয়ার ইট, বালি, লোহার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি মাটি ভরাটের কাজও করেন। বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এ কারণে সরওয়ারকে খুন করা হয়েছে।
সরওয়ারের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, তিনদিন আগে ভারতে থাকা সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ছেলেকে ফোন করে বলেছেন, তোমার সময় শেষ। যা খাবার খেয়ে নাও। এছাড়া কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদের সহযোগী রায়হানের নেতৃত্বে সরোয়ারকে খুন করা হয়েছে। হত্যার সময় মুখোশ পরা ৭/৮ জন যুবক ছিল।
আব্দুল কাদের আরও বলেন, ছোট সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বিভিন্ন সময়ে ফোনে সরোয়ারকে খুনের হুমকি দিত। এজন্য আমরা থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলাম।
সরওয়ার বাবলার মেঝ ভাই আলমগীর হোসেন বলেন, তারা এর আগেও কয়েকবার আমার ভাইকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু এবার তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকে খুন করে।
যে কারণে খুন বাবলা
চট্টগ্রামে কুখ্যাত ‘এইট মার্ডার’ মামলার আসামি ও সাজ্জাদ হোসেন খানের সহযোগী হিসেবে আলোচনায় আসেন সরওয়ার বাবলা। পরবর্তীতে গুরু সাজ্জাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে নিজস্ব গ্যাং গঠন করেন তিনি। এরপর থেকেই সাজ্জাদ ও বাবলার মধ্যে বিরোধ চলতে থাকে। বাবলাকে একাধিকবার টার্গেট করে হামলার ঘটনাও ঘটে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সাজ্জাদ হোসেনের হাত ধরে অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন বাবলা ও তার সহযোগী নুরুন্নবী ম্যাক্সন। সাজ্জাত হোসেন খানের দুই শিষ্য ছিলেন সরওয়ার আর ম্যাক্সন। অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে চট্টগ্রামে ত্রাস ছড়াতেন তারা। ২০১১ সালের জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল থেকে গ্রেফতার হন ম্যাক্সন। তার তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে বাবলাকেও আটক করা হয়।
২০১৭ সালে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে কাতারে চলে যান দুজনই। পরে সেখান থেকে চাঁদাবাজি পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ ছিল পুলিশের। কাতারে মারামারির ঘটনায় এক মাস কারাভোগের পর ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাবলাকে দেশে ফেরত পাঠায় কাতার পুলিশ।
ঢাকায় পৌঁছে বিমানবন্দরে গ্রেফতার হন তিনি। পরদিন চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার খন্দকীয়া পাড়ায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তার বাসা থেকে ৩০ রাউন্ড গুলিসহ একটি একে-২২ রাইফেল ও একটি এলজি উদ্ধার করে। ধারণা করা হয় মূলত সরওয়ার ও ম্যাক্সন পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই অপরাধ সম্রাজ্যের যবনিকা টানতে চেয়েছিলেন।
২০২২ সালে রহস্যজনকভাবে কলকাতায় মৃত্যু হয় ম্যাক্সনের। সরওয়ারও ছিলেন টার্গেটে। সরওয়ার এজন্য সাজ্জাদ হোসেন খানকে দায়ী করতেন। দেশে সাজ্জাদ হোসেন খানের সম্রাজ্য দেখাশোনার দায়িত্ব নেন আরেক সাজ্জাদ। যে পরিচিতি পায় ছোট সাজ্জাত হিসেবে। তখন সাজ্জাদের ডান হাত হয়ে ওঠেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি সাজ্জাদ।
প্রায় চার বছর পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই সরওয়ার আবার গ্রেপ্তার হন। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বাবলা।
এরপর নগরের বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী এলাকার আধিপত্য নিয়ে লড়াই চলে ছোট সাজ্জাদ ও বাবলার মধ্যে। এই বিরোধের জের ধরে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ইতোমধ্যে ছয়টি খুন হয়েছে। এর পর থেকে পুলিশ ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারে উঠে পড়ে লাগে। ঘোষণা করা হয় পুরস্কারও। গত ১৫ মার্চ রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা কমপ্লেক্স থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করে প্রকাশ্যে হুমকি দেন, ‘যারা এ ঘটনা ঘটাইছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। মাথায় রাইখো। এতদিন আমরা পলাতক ছিলাম। এখন তোমাদের পলাতক থাকার পালা।’
এর আগে তামান্না অভিযোগ করেছিলেন, সাজ্জাদকে ধরতে যখন পুলিশ অভিযানে আসে, তখন সঙ্গে বাবলাও ছিল। এটির প্রতিশোধ তারা নিবেই নিবে। সাজ্জাদ ও তামান্না কারাগারে থাকা অবস্থাতেই এবার খুন হলেন সেই বাবলা।
জানা গেছে, কারাগারে থাকাকালে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে বাবলার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুক্তির পর আসলাম চৌধুরী ছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। মাত্র এক মাস আগে বাবলা বিয়ে করেন। সেই বিয়েতে এরশাদ উল্লাহ ও আবু সুফিয়ানসহ বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকে বাবলাকে এই বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও দেখা গেছে।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। বিএনপির প্রার্থীর গণসংযোগ করার সময় সেখানে শত শত লোক অংশ নেন। সরোয়ার সেখানে অংশ নিলে সন্ত্রাসী দুটি দলের মধ্যে পূর্ববিরোধের জেরে তাকে গুলি করা হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, দুষ্কৃতকারীদের লক্ষ্য ছিল নিহত সরওয়ার বাবলা। দুষ্কৃতকারীরা সরোয়ার বাবলার মৃত্যু নিশ্চিত করতে গুলি করে। ঘটনার সময় তিনি এরশাদ উল্লাহর সঙ্গেই ছিলেন। সরওয়ারের অপরাধের ইতিহাস আছে।
সিএমপি কমিশনার বলেন, অপরাধ যেখানে হচ্ছে আমরা অধিকাংশদেরই গ্রেপ্তার করছি। কিন্তু আসামিরা ঘটনার পরপর রিমোট এলাকায় চলে যায়। সেখান থেকে তাদের ধরা খুবই দুষ্কর।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।