দীর্ঘদিনের কাঁচামাল সংকট, এলসি জটিলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের অন্তত ১১টি উৎপাদনমুখী কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার থেকে কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে চাকরি হারানো শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বর্তমানে কর্মরতদের আগামী ৬ আগস্টের মধ্যে সব পাওনা পরিশোধ করা হবে বলে তাদের জানানো হয়েছে।
গ্রুপটির একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কর্মরত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হঠাৎ করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। গত প্রায় দুই বছর ধরে নানা সংকটের কারণে কারখানাগুলো সীমিত পরিসরে কিংবা বন্ধ অবস্থায় চলছিল। সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর নতুন কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়। গুদামে থাকা মজুত কাঁচামাল দিয়ে এতদিন উৎপাদন চালানো হলেও এখন সেই মজুতও শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কয়েক মাস আগে কিছু শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে যাদের চাকরি শেষ হচ্ছে, তাদেরও নিয়ম অনুযায়ী সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
শ্রমিকদের দাবি, উৎপাদন বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগার, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, ব্যাগ কারখানা, একটি ফিড মিলসহ আরও কয়েকটি শিল্প ইউনিট। তবে গ্রুপটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এখনও চালু রয়েছে।বন্ধ হওয়া অধিকাংশ কারখানা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শিল্প এলাকায় অবস্থিত।
চাকরি হারানো এক শ্রমিক শাহাদাত বলেন, "হঠাৎ করেই চাকরি চলে গেল। পরিবারের খরচ, সন্তানের লেখাপড়া আর বাসাভাড়া কীভাবে চালাব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা। নতুন চাকরিও সহজে মিলছে না।"
শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে আগামী এক মাসের মধ্যে বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এস আলম গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার (এইচআরডি) মোহাম্মদ হোসেন রানা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ব্যাংকগুলো এলসি সুবিধা না দেওয়ায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একে একে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
তবে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম বলেন, "কারখানা একেবারে বন্ধ বলা যাবে না। কাঁচামালের অভাবে আপাতত উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হলে উৎপাদন আবার শুরু করা যেতে পারে।"সরকার পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন আর্থিক ও আইনি জটিলতায় পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গ্রুপটির প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে পাওনাদার ব্যাংকগুলোর দাবি, ঋণ খেলাপি, চেক প্রত্যাখ্যান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রুপটির বিরুদ্ধে ৫০০টির বেশি মামলা চলমান রয়েছে। কয়েকটি মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাসহ আদালতের বিভিন্ন আদেশ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।