দক্ষিণ পূর্ব

কর্নেল অলি এখন ওয়ান ম্যান আর্মি

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
কর্নেল অলি এখন ওয়ান ম্যান আর্মি

ছবি :কর্নেল ( অব) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম

ওমর ফারুক মাসুম: 

নিজ এলাকা চট্টগ্রামে এখনও বেশ জনপ্রিয় কর্নেল ( অব) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম।তবে তাঁর দল এলডিপি সেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি।এখন ধীরে ধীরে জন্মস্থান চন্দনাইশেও এলডিপির কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে।সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ আসনে ছেলে ওমর ফারুক ধানের শীষের প্রার্থীর কাছে হারার মধ্য দিয়ে যেন হয়েছে তাঁর এলডিপির কফিনে শেষ পেরেকঠোকা। 

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে এলডিপির সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনও অলি আহমদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা। মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী ও পাঁচবারের সংসদ সদস্য হিসেবে তার পরিচিতি এখনো দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি অংশে প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনেও চন্দনাইশ-সাতকানিয়া অঞ্চলে অলির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল।কিন্তু এখন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। 

 

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একসময় এলডিপির সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেক নেতা-কর্মী ধীরে ধীরে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলে চলে গেছেন। চলতি বছরের ২ মে সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিনের হাতে ফুলে তোড়া দিয়ে শতশত এলডিপির নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। যা সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এলডিপি ছেড়ে বিএনপিতে নতুন যোগদানকারীরা বলেছিলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির কর্মসূচিতে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা দল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ১১দলীয় নির্বাচনী ঐক্যেও শরীক দল হিসাবে দুটি আসন পায় এলডিপি। কিন্তু চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে এলডিপির প্রার্থী এম এয়াকুব আলী এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলমকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন এলডিপির একমাত্র প্রার্থী হিসাবে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে অলিপুত্র ফারুক আহমদের প্রতিদ্বন্দিতা

এবং অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়। সমর্থকদের মতে, এটি এখনো ওই অঞ্চলে অলির রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষয়ের একটি ইঙ্গিত।

 

অন্যদিকে রাজনৈতিক সমালোচকরা মনে করেন, চট্টগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এলডিপি একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক দল হিসেবে নয়, বরং অলি আহমদকে কেন্দ্র করেই টিকে আছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন ছাড়া দলটির জন্য রাজনৈতিক পরিসর ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

 

দলটির জন্মের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। বিএনপি থেকে আসা সাবেক সংসদ সদস্য, জেলা পর্যায়ের নেতা এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ এলডিপির সঙ্গে যুক্ত হন। তখন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা এবং ঢাকার কিছু এলাকায় দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান ছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেছিলেন, এলডিপি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দলটির তৃণমূল চট্টগ্রাম অঞ্চলে সক্রিয় থাকলেও দেশের জেলা উপজেলাতে কমিটির কার্যক্রম তেমনটা সক্রিয় নেই। যার ফলে ঝিমিয়ে পড়েছে দলটির তৃণমূলের কার্যক্রম।

 

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনসুর আলম দক্ষিণপূর্বকে বলেন, চট্টগ্রামে বোয়ালখালী ব্যতীত প্রত্যেক উপজেলা-পৌরসভায় আমাদের কমিটি রয়েছে। তবে জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। কারণ দীর্ঘ ১৭ বছরের লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে প্রত্যাশিত রেজাল্ট হয়নি। তবুও আমরা সবাই নিয়মিত কার্যক্রমে জোর দিচ্ছি। সামনের স্থানীয় নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।

 

 অন্যদিকে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের ভ্যানগার্ড হিসাবে কাজ করে ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো। কিন্তু দলটির বর্তমানে ছাত্রসংগঠনের উপস্থিতি কোন ক্যাম্পাসে নেই বললেই চলে। নেই কোন ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি। যুব সংগঠনগুলোর একই অবস্থা। তারা যেন কোথাও নেই। কিন্তু মাঠে ময়দানে না থাকলেও চন্দনাইশ কেন্দ্রিক নেতারা ফেসবুকে পদবী দিয়ে নানা স্ট্যাটাসে সক্রিয়। 

 

এ বিষয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্রদলের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আমিনুল হক তামিম বলেন, চন্দনাইশ কেন্দ্রিক প্রতিটি ক্যাম্পাসে আমাদের কমিটি রয়েছে। বাকি উপজেলাগুলোর ক্যাম্পাসে কমিটি না থাকলেও উপজেলা-পৌরসভা কমিটি রয়েছে। তবে বাকী ছাত্রসংগঠনগুলোর ন্যায় কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

 

আবার অনেকে দলটির সাথে শুরুতে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে দলটি ছেড়ে পুনরায় বিএনপিতে ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ দলটি ছেড়ে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাদের একজন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাবেক সভাপতি ও দলটির উপদেষ্ঠা সিনিয়র আইনজীবী এডভোতেকট কফিল উদ্দিন। 

 

তিনি বলেন, আমি বর্তমানে এলডিপির রাজনীতিতে বিশ্বাস করিনা। কারণ আমার দলের চেয়ারম্যানের সাথে আমার অনেক সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত রয়েছে। যার কারণে আমি দল ছেড়েছি। আর কখনও দলে ফিরবো না এবং সম্ভবনাও নেই।

 

এদিকে, এলডিপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা পড়লেও কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে কর্নেল অলির রয়েছে আলাদা কদর। তিনি বর্তমানে ১১ দলীয় ঐক্যেও সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সরকারের নানান সমলোচনায় ব্যস্ত রয়েছেনে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে প্রধান বক্তা হিসাবে পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি সেখানে নানা পরামর্শ যেমন দিচ্ছেন তেমনি নানান ইস্যুতে সরকারকে হুশিয়ারিও দিচ্ছেন।

 

সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে নিয়ে দলটির চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল অলি আহমদ বলেন, রাজনীতিতে সবাই পেতে চান। কেউ চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রী হতে রাজনীতিতে আসে। যা কখনো গণতান্ত্রিক বা কোনভাবেই সম্ভব না। কিন্তু রাজনীতি হওয়া দরকার মানুষের কল্যাণে।

 

কর্নেল অলি বলেন, বাংলাদেশের কয়েকটা ইসলামী দলছাড়া দেশের জন্য আত্মত্যাগের রাজনীতি কেউ করেনা। সবাই রাজনীতিকে টাকা পয়সা কামানোর দোকান মনে করে। এতে যখন দল বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তখন তারা দল ত্যাগ করে অন্য দলে চলে যায়। কোন রহিমুদ্দীন-কলিমুদ্দীন দল ছেড়ে গেল এতে দলের কোন কিছুই হবেনা।

 

 তিনি দাবি করেন, অতীতে যারা দল ছেড়ে গিয়েছে তারা আবার দলে ফেরত আসার যোগাযোগ করছেন। কিন্তু তাদের কোনভাবেই দলে ফেরানো হবেনা। কারণ রাজনীতি একটি প্রবহমান নদী, যেখানের স্রোত কারো জন্য থেমে থাকেনা। 

 

ক্যাম্পাসে তাঁর দলের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে ভাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কয়েকটা ইসলামিক দল ছাড়া দল পরিচালনায় তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ আমার দলে কোন ব্যাংক ডাকাত যেমন নেই, তেমনি কোন লুটেরারও নেই। আর যাদের কাছে টাকা রয়েছে তারাও দলকে দেয়ার চেয়ে নিতে বেশি প্রস্তুত। যার কারণে দল পরিচালনায় অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে যেতে হয়।

 

দক্ষিণপূর্ব/ আর 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।