মাসুদ ফারহান :
১০ জুলাই ২০২৪। বান্দরবানের তামলোপাড়া টিওবি ক্যাম্প। ঘড়িতে তখন বিকেল ৪টা ২০। হঠাৎ পাহাড় কাঁপিয়ে গুলির শব্দ। কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি- কেএনএ’র একটি সশস্ত্র দল অতর্কিত আক্রমণ চালায় ক্যাম্পে।
গুলির মুখে পিছু হটেননি তিনি। পাহাড়ি শান্তি-শৃংখলা আর সম্প্রীতি রক্ষার শপথ নিয়ে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন সৈনিক মো: আবু হানিফা। বুকের বাম পাশে গুলি লাগে। সহযোদ্ধারা দ্রুত তাকে হেলিকপ্টারে তুলে দেন। গন্তব্য সিএমএইচ, চট্টগ্রাম সেনানিবাস।
সন্ধ্যা ৬টায় চিকিৎসকরা জানান, দেশমাতৃকার জন্য এই সন্তান শাহাদাতবরণ করেছেন।
১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার। পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী সেই বীর সেনানীর দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, অন্যদিকে প্রতিকূল প্রকৃতি। এই প্রতিকূলতার মাঝেই আবু হানিফা দায়িত্ব পালন করছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই—পাহাড়ে শান্তি ফেরানো, সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানো।
সেনাবাহিনী বলছে, কেএনএ-এর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। পরিবার, আপনজন আর জীবনের মায়া ত্যাগ করে সন্ত্রাসীদের দমনে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে মরণোত্তর ‘সেনাবাহিনী পদক’-এ ভূষিত করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে কেএনএ-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী। সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় তারা।
এমন পরিস্থিতিতে সৈনিক আবু হানিফার মতো সদস্যরাই রাষ্ট্রের শেষ ভরসা। তামলোপাড়া টিওবি ক্যাম্পে হামলার দিনও তিনি প্রমাণ করেছেন—সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, 'পাহাড়ে কাজ করতে গেলে প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চিত। আবু হানিফা সেই অনিশ্চয়তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে কর্তব্য পালন করেছেন। তার এই আত্মত্যাগ আমাদের সবার জন্য শিক্ষা।'
সেনাবাহিনীর আরেক সদস্য বলেন, 'পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় আবু হানিফার আত্মত্যাগ ও বীরত্ব সকল সেনাসদস্যের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কর্তব্যপরায়ণতা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বেঁচে থাকবেন।
শুক্রবার দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে, পাহাড়ি ক্যাম্পগুলোতে তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত হয়েছে। সহযোদ্ধারা স্মরণ করছেন সেই দিনটিকে—যেদিন একজন সৈনিক কথা দিয়ে কথা রেখেছিলেন।
আবু হানিফার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাহাড়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন সেনা সদস্য বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি পিছু হটেননি। হেলিকপ্টার আসা পর্যন্ত সহযোদ্ধাদের মনোবল ধরে রেখেছিলেন। আজ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তামলোপাড়ার সেই ক্যাম্প এখনো আছে। পাহাড়ে এখনো অভিযান চলে। আর প্রতিটি অভিযানের আগে নতুন সৈনিকদের বলা হয় আবু হানিফার গল্প।'
তিনি আরও বলেন, 'কিছু মৃত্যু শুধু শোকের নয়, তা জাতির জন্য পাথেয়। সৈনিক মো: আবু হানিফার শাহাদাত তেমনই একটি নাম—যা পাহাড়ের শান্তির জন্য উৎসর্গ করা একটি জীবনের নাম।'
শুক্রবার (১০ জুলাই) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক শোকবার্তা প্রকাশ করে।
শোকবার্তায় বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ)-এর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন সৈনিক মো. আবু হানিফা। দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।