চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে চুরি-ডাকাতির ঘটনা। এতে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কারসহ বসতঘরের মূল্যবান মালামাল হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই রাতের শুরুতে উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের রাজমহল ক্লাবসংলগ্ন আমির খাঁন চৌধুরী পাড়ায় একটি বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ২০ হাজার টাকা লুট করা হয়।
এর পাঁচ দিন পর, ১৯ জুলাই চুনতি ইউনিয়নের সুফিনগর মসজিদে আর-রাহমা, স্থানীয়ভাবে বেড়ার মসজিদ নামে পরিচিত, সেখানে চুরির ঘটনা ঘটে। চোরের দল মসজিদ থেকে প্রায় ৪০০ গজ বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায়।
গত ১৬ আগস্ট আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তজু মুন্সীর গ্যারেজ এলাকায় মৃত মাস্টার জসিম উদ্দিনের বাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। প্রায় ১৫ সদস্যের একটি ডাকাত দল পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ১৮ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত ৩ আগস্ট দিবাগত রাতে লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের দরবেশহাট এলাকার শাহী দরবেশিয়া জামে মসজিদে চুরি হয়। চোরের দল জানালার গ্রিল কেটে মসজিদের আইপিএসের ব্যাটারি নিয়ে যায় এবং দানবাক্স ভেঙে নগদ টাকা চুরি করে। পরদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়তে এসে মুসল্লিরা বিষয়টি দেখতে পান।
এদিকে উপজেলার কলাউজান ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী হায়দারের বাড়িতেও ফের চুরির ঘটনা ঘটেছে। আলী হায়দার চট্টগ্রাম শহরের ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত। তার বড় ভাই ওমর ফারুক সাংবাদিকতার কারণে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। ছোট ভাই জায়েদ পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে গ্রামের বাড়িটি অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকে।
আলী হায়দার জানান, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও তাদের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছিল। এবার গত ২০ আগস্ট দিবাগত রাতে ফের চোরের দল বাড়িতে হানা দেয়।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে থাকা অবস্থায় সকালে মেঝ চাচির মাধ্যমে জানতে পারি আমাদের বাড়িতে আবারও চুরি হয়েছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। আমি বাড়ির পথে আছি। সবকিছু দেখার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যাবে।’
পুলিশের টহল নিয়ে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পুলিশের টহল নেই বললেই চলে। এর সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত রয়েছে। তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত এবং নেশার টাকা জোগাড় করতে এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লোহাগাড়ার এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অপরাধীরা যদি বারবার এমন দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটাতে পারে, তাহলে পুলিশের টহল, গোয়েন্দা তৎপরতা ও অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলছে না বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। চোর-ডাকাতের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও পেশাদার পুলিশিং জোরদার করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তাদের মতে, অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
লোহাগাড়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সার্কেল) আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ‘লোহাগাড়ার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। রাতে পুলিশের চারটি টিম কাজ করছে। এ সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। তবে জনবল সংকটের কারণে আপাতত টিমের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’
এসআই/দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।