দক্ষিণ পূর্ব

প্রিয় ‘ম্যাডাম’ আর ফিরবেন না ক্লাসে

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
পঠিত : ৩৪
প্রিয় ‘ম্যাডাম’ আর ফিরবেন না ক্লাসে

ছবি সংগৃহীত

দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক : 

সকাল হলেই স্কুলে আসতেন। শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সারাদিন। কখনো পড়াতেন, কখনো স্নেহে কাছে টেনে নিতেন। বছরের পর বছর এভাবেই কেটে গেছে তাঁর কর্মজীবন। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, ছিলেন মায়ের মতো আপনজন।কিন্তু রোববার সেই পরিচিত স্কুলেই নেমে আসে শোকের ছায়া।

দুপুরে স্কুলের মাঠে এসে থামে একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। কাচঘেরা গাড়ির ভেতর নিথর হয়ে শুয়ে ছিলেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন।

প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবার দেখতে ছুটে আসে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। কেউ কাচের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে, কেউ অঝোরে কাঁদে। তাদের যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না—যে ম্যাডাম প্রতিদিন স্কুলে এসে তাদের পড়াতেন, আদর করতেন, সেই ম্যাডাম আর কোনোদিন শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শেষ বিদায়ের মুহূর্তে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি সহকর্মী, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও। স্কুলের মাঠজুড়ে তখন শুধু কান্না আর স্মৃতিচারণ।

রনজিলা পারভীনের জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে এই স্কুল ও শিক্ষার্থীদের ঘিরে। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হন। প্রায় চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন, গড়ে তুলেছেন ভালোবাসা দিয়ে।

কিন্তু চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়াই হয়ে গেল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।

শনিবার ভোরে স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় যান ৫৭ বছর বয়সী রনজিলা। হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় রিকশায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তাঁর হাতে থাকা ব্যাগ টান দিলে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি।

গুরুতর অবস্থায় তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন এই শিক্ষক। তবে ঘটনার এক দিনের মধ্যেই মামলার মূল সন্দেহভাজনসহ দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

র‌্যাব-২ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুজন হলেন মো. মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনি এবং তার সহযোগী সেড্রিক। রোববার রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, শনিবার সকালে স্বামীর সঙ্গে চিকিৎসার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় আসেন রনজিলা পারভীন। তারা রিকশায় করে ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামীয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাচ্ছিলেন।

রিকশাটি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দেন। একপর্যায়ে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিন শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা দুই ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর হেফাজতে ছিল। নিহত শিক্ষিকার স্বামীও ঘটনাস্থলে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করেছেন।

গ্রেপ্তার পনি গাজীকে পেশাদার ছিনতাইকারী হিসেবে দাবি করেছে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানাসহ চাঁদপুরে চুরি, ছিনতাই, মাদক, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।

রনজিলা পারভীনের শিক্ষকতা জীবনও ছিল দীর্ঘ। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রায় চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে ছাপ রেখে গেছেন তিনি।

শনিবার গভীর রাতে ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়। রোববার দুপুরে প্রিয় কর্মস্থলের মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শেষবারের মতো প্রিয় শিক্ষিকাকে বিদায় জানাতে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে গাবতলীর দাড়াইল গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় রনজিলা পারভীনকে।

আরএইচ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।