দক্ষিণ পূর্ব

কোন পথে বাংলাদেশ?

sathi
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫
পঠিত :
কোন পথে বাংলাদেশ?
সাইফুল ইসলাম 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারে দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছিলো গত বছরের ৫ আগস্ট।  আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী পালিয়ে গেছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে।  সেই সঙ্গে পালিয়েছে হাসিনা আমলে জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করা অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও।  আবার কেউ কেউ পালাতে না পেরে গ্রেফতার হয়ে আছেন জেলখানায়। তবে হাসিনাসহ বেশিরভাগ রাঘব-বোয়ালরাই এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে ।  তাদের  কেউ কেউ মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা দিয়ে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। তবে তেমন সুবিধা করতে পারছে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্তে অন্তবর্তী সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখে এক বৈষম্যহীন সুন্দর দেশ গড়ার। কিন্তু সে আশার অন্তরায় হয়ে দাঁড়য় নানা আন্দোলন।

  গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে একের পর এক আন্দোলনে সরকারকে আরও চাপের মুখে পড়েছেন। সেই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা  ড. মুহাম্মদ ইউনূসও রয়েছেন  অস্বস্তিতে। সম্প্রীতি সরকারী চাকরি ( সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ খসড়া বাতিললর দাবিতে আন্দোলন করছেন সচিবালয়ের কর্মচারী ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তরা। এর আগে  ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়রের শপথের জন্য বিএনপির ইশারক হোসেন টানা আন্দোলন করেছে।  এছাড়া ১১ তম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলন করছে প্রাথমিকের শিক্ষকরা।  এইসব আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূস পতত্যাগের কথা ভাবছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বৈষম্যবিরেধী ছাত্রদের দল এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর একরকম অনুরোধেই প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ থেকে সরে আসেন। 

যে পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ: 
একদিকে নানা আন্দোলন যেমন দেশের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মব ভায়োলেন্স,  চুরি- ছিনতাই,  ডাকাতি, পুলিশকে ভয় না পাওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে অপরাধের মাত্র বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যা হলেই শুরু হয় ছিনতাই। এই চিত্র এখন ঢাকার সব জায়গায়।  শনিবার মগবাজরে দিনে দুপুরে এক ছাত্রে ব্যাগ- মোবাইল ছিনিয়ে নেয় তিন ছিনতাইকারী। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। 

নির্বাচনের সময়সীমা: 
এছাড়া নির্বাচনের সময়সীমা জুন কেন এই সন্দেহ  বিএনপির।  এত আলোচনা ও দাবির পরও জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন ডিসেম্বরের মধ্যে নয়, কেন সেটি প্রাকৃতিক বৈরী মৌসুম জুন পর্যন্ত নিতে হবে, সেটা বুঝে উঠতে পারছে না বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, এ নিয়ে সংশয়-সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
বিএনপি মনে করছে, নানাভাবে নির্বাচন বিলম্ব করার জন্য কিছু দৃশ্যপট তৈরি করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির নেতারা ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সে ঘোষণা না আসায় তারা হতাশ।
এ বিষয়ে  মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, "সরকারের কাছে নির্বাচন বিষয়ে আমরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আশা করেছিলাম। সেটি হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার আলোচনার বিষয়ে তার প্রেস সচিবের মাধ্যমে সরকারের যে বক্তব্য পাওয়া গেছে, তাতে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও রোডম্যাপের ঘোষণা না থাকায় বিএনপি হতাশ হয়েছে। 
নির্বাচন কবে হবে, সেটা স্পষ্ট করা দরকার বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে জনগণের বড় ধরনের ভোগান্তি ছাড়া একটি স্বস্তিজনক সময়ে নির্বাচন হতে পারে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন  ‘ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার একদিনও এদিক-সেদিক হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কাজেই এগুলো নিয়ে অন্য ধরনের কথা বলাও উচিত ছিল না।’ 

বিএএসএফের পুশ ইন :  
প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশে পুশ ইন করছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ।  মঙ্গলবার ভোরে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার মোকামপুঞ্জি ও মিনাটিলা সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ৬৬ জনকে পুশ ইন করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। যাদেরকে পুশ ইন করা হয়েছে, তারা এখন বিজিবির জিম্মায় রয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওসমান গণি। এদিন কুরিগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ১৪ ভারতীয়কে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে বিএসএফ। এছাড়া ফেনী সীমান্ত দিয়ে  ৩৯ জন,  হবিগঞ্জের  চুনারুঘাটের কালেঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৯ জন এবং  চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও মেহেরপুর জেলার সীমান্ত দিয়ে মঙ্গলবার ৭০ জনকে পুশ ইন করেছে  বিএসএফ। এর আগে ২৫ মে মৌলভীবাজারের  বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় নারী ও শিশুসহ ১২১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছে  বিজিবি।  ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এসব বাংলাদেশিকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করে বলে জানিয়েছে বিজিবি। 

চিকেন নেক নিয়ে উত্তেজনা:
এছাড়া  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশের চার পাশ ঘিরে ফেলছে ভারত।এ উন্নয়ন অবকাঠামোতে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বাকি তিন দিকে সড়ক ও রেলপথ থাকছে। পশ্চিমে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের ভেতর দিয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কালাদান প্রকল্প।বাংলাদেশের উত্তরে চিকেন নেকে ভারতের মিসাইল ও জঙ্গি বিমান মোতায়েন ছাড়াও ফেনী চিকেন নেক বিচ্ছিন্ন করে ফেলার উসকানিমূলক বার্তা ভারতীয় মিডিয়াগুলো অব্যাহতভাবে দিয়ে যাচ্ছে।
এসব দিক বিবেচনা করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চার পাশ ঘিরে ভারতের এ ধরনের অবকাঠামো সামরিক আগ্রাসনে ব্যবহার হতে পারে কি না সে প্রশ্নেরও গুরুত্ব রয়েছে।

করিডোর নিয়ে বিতর্ক:
তাছাড়া মিয়ানমারের রাখাইনের রোহিঙ্গাদের জন্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একটি হিউম্যানিটারিয়ান প্যাসেজ বা মানবিক করিডর দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে; বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এই তথ্য প্রকাশের পর মানবিক করিডর ইস্যুটি নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক হচ্ছে। করিডর বিষয়ে সরকারের এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাখ্যা দাবি করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
বিএনপি মহাসচিব স্পষ্টতই বলেছেন, "এ ধরনের সিদ্ধান্তে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, সরকার তথাকথিত 'মানবিক করিডর' নিয়ে জাতিসংঘ অথবা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেনি।  রাখাইন রাজ্যে যদি জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সাহায্য দেয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে রাজি হবে–– এটাই আমাদের অবস্থান," বলেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। 

সরকারের নতুন চ্যালেঞ্জ: 
 প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের 'কথিত পদত্যাগের ভাবনা' নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটের আপাত নিরসন হলেও প্রকৃত অর্থে সংকট কাটেনি। সরকারের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন  চ্যালেঞ্জ।  মূলত সরকারের দুই 'ছাত্র' উপদেষ্টা ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ চেয়ে বিএনপির আনুষ্ঠানিক দাবির পাশাপাশি দলগুলোর নির্বাচনের জন্য তারিখসহ রোডম্যাপ চাওয়ার কারণে সামনে নতুন সংকটের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। আবার পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ শনিবার যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানেও 'দলগুলোকে চাপ প্রয়োগ ও হুমকি দেয়ার সুর' আছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। 

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, সরকারের নিরপেক্ষতার স্বার্থেই দুই উপদেষ্টার পদত্যাগসহ তাদের দাবিগুলো মেনে নেয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।অন্যদিকে নতুন দল এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলছেন, 'পদত্যাগ জনিত' সংকটের নিরসন হয়েছে, কিন্তু বিএনপির নতুন নতুন শর্তের কারণেই সংকটের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোঃ তাহের বলছেন, নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হলে সংকটের আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না বলেই তার ধারণা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন দাবি নিয়ে সরকারের ওপর হয়তো চাপ বাড়াচ্ছে বিএনপি, কিন্তু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা নিয়ে বিলম্ব হলে এসব দাবিকে ঘিরেই সংকট জোরদার হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সাথে সরকারের সম্পর্ক কেমন হয়, তাও সামনে দেখার বিষয় হবে বলে তারা মনে করেন।
 রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে করিডর, চট্টগ্রাম বন্দর ও নির্বাচনের তারিখ নিয়ে সম্প্রতি সেনাপ্রধানকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে যেসব বক্তব্য এসেছে, সেসব বিষয়ে সরকারের দিক থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য আসেনি।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।