মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
‘গ্যাস! গ্যাস!’ জাহাজের ভেতর থেকে সহকর্মীদের চিৎকার শুনেই দৌড়ে গিয়েছিলেন মহেশখালীর মোহাম্মদ সেলিম। উদ্দেশ্য ছিল গ্যাসে আক্রান্ত শ্রমিকদের উদ্ধার করা। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনিও আক্রান্ত হন বিষাক্ত গ্যাসে। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। এরপর আর কিছু মনে নেই তার।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে শুক্রবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া সেলিম এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সেলিম বলেন, যে গ্যাসে অন্যরা আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের উদ্ধার করতে গিয়েই আমরাও গ্যাসে আক্রান্ত হই। মনে হচ্ছিল আর ২০ সেকেন্ড ভেতরে থাকলে আমিও মারা যেতাম।’
সেলিমের ভাষ্য, অন্য দিনের মতো শুক্রবার সকালেও কাজে গিয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক জাহাজের ভেতরে ঢুকে কাটিংয়ের কাজ শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে চিৎকার ও কান্নার শব্দ শুনতে পান বাইরে থাকা শ্রমিকেরা।
‘গ্যাস! গ্যাস!’—চিৎকার শুনে সহকর্মীদের উদ্ধারে ছুটে যান সেলিমসহ কয়েকজন।
তিনি বলেন, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস কাটিংয়ের পর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে যারা কাটিংয়ের কাজে ছিলেন, তারাই আক্রান্ত হন। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে একে একে আরও শ্রমিক গ্যাসের কবলে পড়েন।
সেলিম বলেন, ‘অনেকের মুখে মাস্ক ছিল। কেউ কেউ কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল। কিন্তু গ্যাসের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। ভেতরে ঢোকার পর আর টিকতে পারিনি। বাইরে আসার পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে জাহাজ কাটার কাজ করছেন সেলিম। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি তার।
তার চোখের সামনে সহকর্মীরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়লেও কিছু করার ছিল না। যারা অন্যদের বাঁচাতে গিয়েছিলেন, তাদেরও অনেকে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন।
শুধু সেলিম নন, এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৯ শ্রমিক। তাদের কয়েকজনও সহকর্মীদের উদ্ধারে গিয়ে মারা গেছেন বলে স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
নিহত আব্দুল আলিম সুজনের ভাই আব্দুল আউয়াল সুভাষ জানান, প্রথমে একজন শ্রমিককে উদ্ধার করে ওপরে নিয়ে আসেন সুজন। পরে আবার নিচে নামলে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকেরা।
সেলিমের মতো যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের কাছেও এখন সেই কয়েকটি মুহূর্ত যেন দুঃস্বপ্ন। কাজে গিয়েছিলেন প্রতিদিনের মতোই। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে গেছে সবকিছু।
হাসপাতালের শয্যায় সেলিমের কণ্ঠে তাই একটাই উপলব্ধি—জীবন যে এতটা অনিশ্চিত, তা কাজের জায়গায় দাঁড়িয়ে সেদিন আবারও বুঝেছেন তিনি।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।