দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রামের ৫ জেলায় বয়স্ক ভাতা প্রাপ্তদের নিয়ে গবেষণায় যা জানা গেলো

sathi
প্রকাশ : ২ মার্চ ২০২৫
পঠিত :
চট্টগ্রামের ৫ জেলায় বয়স্ক ভাতা প্রাপ্তদের নিয়ে গবেষণায় যা জানা গেলো

ছবি: গুগল থেকে সংগৃহীত


মোহাম্মদ ফারুক
দেশে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলায় বয়স্কভাতার জি-টু-পি পদ্ধতি নিয়ে এক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। গবেষণাটির মাধ্যমে উঠে এসেছে অজানা অনেক তথ্য-উপাত্ত। এসব প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান বিশিষ্টজনরা। এতে বয়স্কভাতার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ একগুচ্ছ সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। 
গবেষণায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী অনেকেই বয়স্ক ভাতায় তালিকাভুক্ত না হওয়া, ভাতা নিয়মিত না পাওয়া, একজনের টাকা অন্যজনে তুলে নেওয়াসহ এমন নানা অভিযোগের ব্যাপারে করণীয় নিয়ে গবেষণায় বেশকিছু সুপারিশ ও পরামর্শ তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণার উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়গুলো হলো- ‘বয়স্ক ভাতা’ সমাজে ৯৮ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তির সম্মান বাড়িয়েছে। এ ভাতার কারণে সামাজিক অনুষ্ঠানে ৭৩ দশমিক ১৪ শতাংশের আমন্ত্রণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবীণ ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এই ভাতা। ৪১ দশমিক ১ শতাংশ প্রবীণের পরিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯০ শতাংশ জি-টু-পি (গভমেন্ট টু পার্সন) প্রক্রিয়ায় ভাতা বিতরণকে ইতিবাচক মনে করছেন। এই পদ্ধতিতে ভাতা আতœসাৎ করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ৭০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সার্বিক বিশ্লেষণে জি-টু-পি পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রবীণবান্ধব বলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে ‘বয়স্কভাতা জিটুপি পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিতরণ: একটি মূল্যায়নধর্মী সমীক্ষা’ শিরোনামে গবেষণাটি চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ টি জেলার ৬ টি ইউনিয়ন ও ২ টি ওয়ার্ডে পরিচালনা করা হয়। এলাকাগুলো হলো- চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১৫ নং ও ৩৪ নং ওয়ার্ড এবং বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরনদ্বীপ ইউনিয়ন, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার রূপসীপাড়া ইউনিয়ন, কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়ন ও কুতুবদিয়া উপজেলার বড়খোপ ইউনিয়ন, লক্ষীপর জেলার রামগড় উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়ন এবং কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার বড় শালগড় ইউনিয়ন। এসব এলাকার ৩৫০ জন বয়স্ক ভাতা ভোগী থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি স্বাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়। 

গবেষণাটির পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে ছিল সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়। এটির পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক, বর্তমানে জাতীয় সমাজসেবা একাডেমির অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ। তার নেতৃত্বে একটি টিম ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় একবছর ধরে গবেষণা কাজটি পরিচালনা করা হয়। এটি চূড়ান্ত করতে আট ক্যাটাগরিতে অর্ধশত প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন তথ্যসংগ্রহকারীরা। সম্প্রতি চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। 
গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বয়স্ক ভাতা ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবীণের আংশিক মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম। আর ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশের মতে সামান্য পরিসরে মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম। গবেষণায় বয়স্ক ভাতার কারণে প্রবীণদের গুরুত্ব বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে এসেছে। পরিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ৪১ দশমিক ১ শতাংশ প্রবীণের। ২৩ শতাংশ বলছেন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এখন তাদের ডাকা হয়। ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা মোটামুটি অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। 

গবেষণার একটি অন্যতম ইতিবাচক ফলাফল হচ্ছে পারিবারিক সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে এ কর্মসূচি বিশেষ অবদান রাখছে। এই ভাতার কারণে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবীণের পারিবারিক সম্মান, তাদের সেবা ও যত্ন বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলছেন ক্রমান্বয়ে সেবা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ভাতা স্বাস্থ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে সক্ষম মনে বলছেন ৮৪ শতাংশ প্রবীণ। ৭৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রবীণের মতে এটি গুণগত জীবনমান রক্ষায়ও অবদান রাখছে। 
উত্তরদাতার শিক্ষাগত জ্ঞান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৫৭ দশমিক ১৪ শতাংশ নিরক্ষর, স্বাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ৩১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ালেখা সম্পন্ন রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ২৯ শতাংশের, প্রাথমিক পর্যায়ে ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বয়স্কভাতা গ্রহণকারী ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা প্রবীণ নিজেই পরিবার প্রধান এবং নিজের উপর নির্ভরশীল। আর ৪৪ শতাংশ সন্তানের উপর নির্ভরশীল। ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ স্বামী/স্ত্রী পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। এ গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বয়স্কভাতা জি-টু-পি পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিতরণের প্রভাব মূল্যায়ন করা। 
প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিটুপি পেমেন্ট ব্যবস্থাকে ৯৬ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবীণ ইতিবাচক ও সহজ মনে করেন। বয়স্ক ভাতা গ্রহণে ৬২ শতাংশ প্রবীণ নিজস্ব মোবাইল সেট ব্যবহার করেন। তবে ৩৭ শতাংশ তৃতীয় পক্ষ বা প্রতিবেশীর মোবাইল ব্যবহার করেন। 
গবেষণায় উল্লেখ করা দেশে বিভাগভিত্তিক বয়স্কভাতা বিতরণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৮৬২ জন প্রবীণ বয়স্কভাতা গ্রহণ করেন। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৭১ জন, খুলনায় ৭ লাখ ২০ হাজার ৮২৪, রাজশাহীতে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৪, রংপুরে ৮ লাখ ৫১ হাজার ৯০০, বরিশালে ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৬১, ময়মনসিংহে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৩ এবং সিলেটে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৫ জন বয়স্কভাতা গ্রহণ করেন।
গবেষণা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিচালক মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ বলেন, বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আর্থসামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা এ গবেষণা পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য। জি-টু-পি পদ্ধতিতে ভাতা বিতরণে প্রভাব যাছাই করাও এটির অন্যতম লক্ষ্য। একঝাঁক তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তা একেবারে গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে গবেষণার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গবেষণাটির মাধ্যমে ফুটে উঠেছে প্রবীণদের বাস্তব চিত্র। এমন গবেষণা দেশে এটিই প্রথম। 
তিনি বলেন, এ গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ। কর্মসূচির মানোন্নয়নে এ গবেষণা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। সামগ্রীক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পেরে আমি আনন্দিত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) মোশাররফ হোসেন বলেন, অনেক অজানা তথ্য-উপাত্ত এ গবেষণাটির মাধ্যমে উঠে এসেছে। এর প্রাপ্ত ফলাফল ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে ৯০ বছরের উর্ধ্বে প্রবীণদের আলাদাভাবে আর্থিক সুবিধা দেওয়া যায় কিনা সেটি বিবেচনা করা উচিত। আর সচ্ছল-অসচ্ছল প্রবীণদের জন্য বিশেষ কিছু করা যায় কিনা এবং বেশি গরিবদের শনাক্ত করে তাদের জন্য কিছু করার সুযোগ আছে কিনা তা চিন্তা করা উচিত। 
গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আগে ম্যানুয়ালি পদ্ধতিতে প্রবীণদের ভাতা দেওয়া হতো। এতে প্রতারণার সুযোগ ছিল। তবে জি-টু-পি প্রক্রিয়ায় ভাতা বিতরণের কারণে এই সুযোগ এখন আর নেই। বয়স্কভাতা প্রবীণদের পরিবারে বহুগুণ মূল্যায়নের সুযোগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি এটি মানসিকভাবেও স্বস্তি ফিরে দিয়েছে। 
তিনি বলেন, গবেষণার কার্যক্রমে এমন অনেক প্রবীণ পাওয়া গেছে যাদেরকে ভাতা না পাওয়ার আগে নিজের পরিবারই মূল্যায়ন করতো না। 
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক কাজী নাজিমুল ইসলাম বলেন, গবেষণার উদ্যোগটি খুবই গ্রহণযোগ্য। এটির কার্যকারিতাও ইতিবাচক। এর মাধ্যমে প্রবীণদের আসল চিত্র ফুটে উঠেছে। যা প্রশংসার দাবিদার।

গবেষণার সুপারিশ 
সংশ্লিষ্টরা গবেষণায় বয়স্কভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়াও বয়স্ক ব্যক্তির বয়স ৬০ বছর নির্ধারণ করা, বিনোদন চাহিদা পূরণে ও উৎসবে বিশেষ ভাতা ভাতা প্রদান, প্রতিবন্ধী প্রবীণের জন্য বিশেষ সহায়ক উপকরণ প্রদান, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করতে কেয়ার গিভার সার্ভিস ও জেরিয়াট্রিক্স সার্ভিস চালু করা, জিটুপি পদ্ধতিতে বয়স্কভাতা বিতরণ সম্পর্কে সর্বত্র প্রচারণা জোরদার করা, ভাতাভোগীদের নিজস্ব মোবাইল সেট ব্যবহারে অভ্যস্থ করা, নিবন্ধিত সিমের মাধ্যমে ভাতা বিতরণ নিশ্চিত করা, বয়স্কভাতার অর্থ প্রতারকচক্র হতে সুরক্ষিত করতে ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবস্থার প্রবর্তন করাসহ নানা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রসঙ্গত , সমাজসেবা অধিদপ্তর সর্বাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যার মধ্যে অন্যতম বয়স্কভাতা কর্মসূচি। বর্তমানে দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যক্তি বয়স্কভাতা গ্রহণ করছে। দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতার মাধ্যমে  ভাতার অর্থ বিতরণের লক্ষে সরকার জি-টু-পি পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে। তবে আসল ভাতাভোগীর টাকা অন্য আরেকজন তুলে নিচ্ছে বলে প্রায়ই অভিযোগ উঠে। এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে উত্তরণে করণীয় ঠিক করতে এই গবেষণার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।