মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন:
মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়। আছে ওষুধ, ফগার মেশিন, শত শত কর্মী এবং বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রামও। তবু চট্টগ্রাম নগরীতে কমছে না মশার উপদ্রব। বরং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির এই দিনে চট্টগ্রামের ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান যেন নগরবাসীর জন্য বড় সতর্কবার্তা। গত পাঁচ বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজার ২১৬ জন। প্রাণ হারিয়েছেন ২২৩ জন। চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। বছরের এখনও চার মাসের বেশি সময় বাকি থাকলেও জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে তুলনামূলক কম ছিল, সেখানে বর্ষা শুরু হতেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। মারা গেছেন তিনজন।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন। প্রথম ছয় মাসে মোট আক্রান্ত হন ২৯৮ জন।
কিন্তু জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। ওই মাসে মৃত্যু হয় দুজনের। এরপর আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৬৬৩ জন ।
অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টের প্রথম ১৯ দিন—মাত্র ৫০ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৯ জন, যা চলতি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ। আগস্ট শেষ হওয়ার আগেই আক্রান্তের এমন ঊর্ধ্বগতি এডিস মশার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় গত পাঁচ বছরের হিসাবেও।
২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মৃত্যু হয় ৪১ জনের। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা যান ১০৭ জন।
২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ৪ হাজার ৩২৩ জনে নামলেও মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মৃত্যু হয় ২৭ জনের।
চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত ১ হাজার ৪৯৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে আক্রান্ত ৩০ হাজার ২১৬ জন, আর প্রাণ হারিয়েছেন ২২৩ জন।
ডেঙ্গুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নগরীতে বাড়ছে এডিস মশার প্রজননও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৮ থেকে ১৮ জুন পরিচালিত সাম্প্রতিক প্রাক-বর্ষা জরিপে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া যায়।
জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতেও লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। নিরাপদ মাত্রা যেখানে ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। আর ব্রেটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশক নিধনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যয় কমেনি। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চসিক। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
তারপরও চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ—মশার উপদ্রব কমেনি।
চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন মাত্র ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
জরিপের নেতৃত্ব দেওয়া বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, আটটি ওয়ার্ডকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো—উত্তর কাট্টলী (১০ নম্বর ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩), জালালাবাদ (২), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯), পাথরঘাটা (৩৪), আন্দরকিল্লা (৩২) ও দক্ষিণ হালিশহর (৩৯)।
মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার অন্যতম প্রধান প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।
জরিপের ভিত্তিতে তিন দিনের মধ্যে জমে থাকা পানি অপসারণ, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নির্মাণাধীন স্থাপনায় নিয়মিত নজরদারি এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া বিআইটিআইডিতে ১২, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৮, চট্টগ্রাম সিএমএইচে ৫, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৩১ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালভিত্তিক এই হিসাবে মোট ১৪২ জন রোগীর চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ হিসাবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১৬৩ জন। সময়। ভেদে রোগী ভর্তি ও ছাড়পত্রের কারণে দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে ধারণা করা যায়।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি মনে করেন , বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। এতে এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। বাসাবাড়িতে সংরক্ষণ করা পানি এবং বিভিন্ন স্থাপনায় জমে থাকা পানিও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে মাত্র সাড়ে তিনশো কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তবুও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা মারার চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। এ কারণে ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছিটানোর চেয়ে মশার লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ দল কাজ করছে।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।