দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম অঞ্চলে জামায়াত জোটের ভরাডুবির নেপথ্যে

দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পঠিত :
চট্টগ্রাম অঞ্চলে জামায়াত জোটের ভরাডুবির নেপথ্যে

ফাইল ছবি

চট্টগ্রামের ভোটের রাজনীতিতে এক ধাপ পিছিয়ে গেলো জামায়াত ইসলামী। ক্যাডারভিত্তিক প্রভাবশালী এই সংগঠনটি নির্বাচনে সারাদেশে ভালো ফলাফল করলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভরাডুবি হয়েছে। এখানকার ২৩টি আসনের মধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র  দুটি আসনে জয়ী হয়েছে। এমনকি জামায়াতের  প্রভাবশালী নেতা সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আজাদও হেরেছেন কক্সবাজারে। জোটে থাকা এলডিপির কর্নেল (অব)  অলির নিজ আসনে তাঁর ছেলে  বিএনপি জোটের প্রার্থীর কাছে হেরেছেন।স্বয়ং এস আলম চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম মাসুদের এলাকা পটিয়ায় জামানত হারিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। ওদিকে চট্টগ্রামে শক্ত ঘাঁটি থাকলেও প্রভাবশালী এই সংগঠনটির ভোটের মাঠের দূরাবস্থার নেপথ্যে কি তা নিয়ে চলছে এখন আলোচনা।

 

জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলার  ১৬ টি আসনের মধ্যে শহরের চারটি আসন ও উত্তর চট্টগ্রামের প্রতিটি আসনেই তাদের ভরাডুবি হয়েছে৷ কেবল সাতকানিয়া -লোহাগাড়া এবং বাঁশখালী আসনে জয় হয়েছে জামায়াতের প্রার্থীর। কক্সবাজারে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও জেলার ৪টি আসনেই হেরেছে জামায়াত। যদিও সেখানের  দুইটি আসনে বিজয়ী ধানের শীষের প্রার্থীর সাথে ভোটের ব্যবধান ছিলো হাজারখানেক। 

 

কক্সবাজারের  ৪ টি আসনের সবটাতেই পরাজিত হয়েছে জামায়াত।এদের মধ্যে কক্সবাজার -১ আসনে ( চকরিয়া -পেকুয়া) বিএনপির হেভিওয়েট নেতা  সালাহউদ্দিন আহমেদ বড় ব্যবধানে জিতেছেন। আসনটিতে সভা সমাবেশে বেশ হাইফ তুলেছিলেন জামায়াতের তরুণ নেতা আব্দুল্লাহ আল ফারুক।কক্সবাজার -২ আসনে হেরেছেন জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আজাদ। তবে কক্সবাজার ৩ ( সদর- রামু) ও কক্সবাজার ৪ ( উখিয়া - টেকনাফ) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরেছে জামায়াত। 

 

রাজনীতি সচেতনরা বলছেন, কওমী ও সুন্নী (মাজার-খানকাপন্থী) ঘরনার ভোটাররা জামায়াতকে ভোট দেয়নি। আবার অনেক আসনে  সুন্নি জোটের আলাদা প্রার্থী ছিলো। তবে জামায়াত ঠেকাতে অনেকে নিজেদের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এদের মধ্যে ফটিকছড়িতে সুন্নী জোটের প্রভাবশালী প্রার্থী শাহজাদা সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারি একতারা প্রতীকে নির্বাচন করে জামানত হারিয়েছে। সেখানে বিএনপির সরওয়ার আলমগীর বিপুল ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন।

 

জামায়াত নেতা মাসুদ আলম বলেন,'চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ধর্মপরায়ণ। বিশেষ করে এখানে কওমি আলেমদের পাশাপাশি তরিকতপন্থীদের ভালো অবস্থান  আছে।এই দুইটি দলের লোকজন প্রকৃতিগতভাবে জামায়াত বিরোধী। বিএনপি এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছে। কওমিদের কাছে বলা হয়েছে জামায়াত আসলে কওমি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে।মওদীদূ মতবাদ (জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদী) প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সুন্নীদের কাছে বলা হয়েছে জামায়াত ক্ষমতায় আসলে মাজার -খানকা ভেঙে ফেলা হবে। ফলে অস্তিত্ব রক্ষায় তারা জামায়াতকে ভোট দেননি।এমনকি হেফাজতের আমীর মাওলানা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বিএনপির পক্ষ নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের লোকজন শেল্টারের জন্য ঢালাওভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন।

 

এই নির্বাচনে জামায়াতের লজ্জার কারণ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম-১২ আসন। এখানে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের প্রার্থী ডা. ফরিদুল ২১৭০৬ টি ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন। মানবিক ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ডা. ফরিদের ভরাডুবির কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে এস আলমের ইসলামী ব্যাংক ইস্যু। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এই কর্মীদের অধিকাংশই পটিয়া উপজেলার। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী ও সাতকানিয়ায়ও এস আলমের আমলের বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের সম্প্রতি বাদ দিয়েছিলো ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মী ও তাদের স্বজনরাও জামায়াতের বিপক্ষে মাঠে কাজ করেছেন।

 

এদিকে পরাজয়ের কারণ হিসেবে বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে জামায়াতের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করছেন অনেকে। স্থানীয় এক সাংবাদিক ফেসবুকে লিখেছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জামায়াত জোট কমপক্ষে ৭টি  আসন পাবে বলে বিশ্বাস ছিলো। সেখানে মাত্র ২ টিতে জয় পেয়েছে তারা। এমনকি কুতুবদিয়া-মহেশখালীতে জনপ্রিয় প্রার্থী সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আজাদও হেরেছেন। হিন্দু সম্প্রাদায়ের ভোট ও কওমি- সুন্নীদের বিরোধিতাই ডুবিয়েছে তাদেরকে। পাশাপাশি এখানে গণমুখী নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে। শাহজাহান চৌধুরী, হামিদ আজাদ, হেলালী (শামসুজ্জামান হেলালী) ছাড়া একজন পরিচিত প্রার্থী দেখান তো। চট্টগ্রাম নিয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবা উচিত।

 

এছাড়া এলাকাভিত্তিক সামাজিক ক্লাব, সংগঠন, মসজিদ, মাদ্রাসা পরিচালনাকারীদের নিয়ে বিএনপি ভোটারদের ম্যানেজ করার চমক দেখিয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের চার আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে জামায়াত মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেনি। চট্টগ্রাম-৯ আসনে চিকিৎসক নেতা  ডা. ফজলুল হককে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি এই আসনের রাজনীতিতে একেবারেই নতুন মুখ। ভোটের তফসিলের সময়েও তাঁর ছিল আমেরিকার নাগরিকত্ব- বিএনপির এই প্রচারণা সাধারণ ভোটারদের কাছে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার পক্ষে খুব বেশি প্রচারণাও ছিল না। এছাড়া বয়োজ্যেষ্ঠ এবং পেশাদার ডাক্তার হওয়ায় ভোটের মাঠে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি তিনি।

 


এছাড়া হাইপ্রোফাইল প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে খুব বেশি সুবিধা কর‍তে পারেননি জামায়াতের প্রার্থী চসিকের সাবেক কাউন্সিলর শফিউল আলম।  চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর- ডবলমুরিং) আসনে  সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানের সন্তান সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে হারতে হয়েছে জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা শামসুজ্জামান হেলালীকে। হেলালীর এই আসনটিতে জামায়াতের পক্ষে প্রচারণায় স্থানীয়দের তেমন ভেড়াতে পারেনি দলটি। যেখানে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ও বাঁশখালী আসনের পাশাপাশি এই আসনটিকেও নিশ্চিত আসন বলে ধরে নিয়েছিলো জামায়াত। সাবেক কাউন্সিলর হেলালী এই আসনে বেশ জনপ্রিয়। 

 


এই অঞ্চলে জোটকে ছেড়ে দেওয়া ৪ টি আসনের ৩টিতে ধানের শীষের প্রার্থীর কাছে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আর কর্নেল অলির এলডিপিকে ছেড়ে আসনে শুরুতে অলির ছেলে ড. ওমর ফারুক বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও শেষ সময়ে এসে হাজারখানেক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

 

এদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনে ডা. আবু নাছের বেশ পরিচিত মুখ হলেও এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের খেলায় প্রভাব পড়েছে দাঁড়িপাল্লায় ভোটের উৎসবে। ভোটের মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ছেদ পড়েছে প্রচারণায়। এই আসনে ভোটের কয়েকদিন আগে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা জোবায়রুল আরিফকে। দেড় বছর ধরে এই আসনে কাজ করলেও ভোটের ১৫-২০ দিন আগে থেকে জোটের দেনদরবারের যাতাকলে পড়ে প্রচারণা বন্ধ রাখেন জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাসের। তবুও তিনি ৫৩ হাজার ৫৬৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। পাশাপাশি ৫ লাখ ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে ৩ হাজার ৩৪৯ ভোট পেয়ে জামানতই হারাতে হয়েছে এনসিপি প্রার্থী জোবায়রুল আরিফকে।

 


পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান আসনে জামায়াতের প্রার্থী এডভোকেট আবুল কালাম ভালো অবস্থানে থাকলেও শেষ মুহুর্তে এসে আসনটি এনসিপির সুজা উদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। নির্বাচনের ফলাফলে এখন জামানত হারাচ্ছেন সুজাউদ্দিন। খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেওয়া হাটহাজারী আসনে রিকশা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন মাওলানা নাসিরুদ্দিন মুনির। নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন তিনি। নাসিরুদ্দিন  হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। যেখানে হাটহাজারীকে হেফাজতের দূর্গ বলা হয়।

 

এআর

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।