দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম নতুন রেলস্টেশনের গণশৌচাগার ইজারা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির গন্ধ

sathi
প্রকাশ : ৪ অক্টোবর ২০২৫
পঠিত :
চট্টগ্রাম নতুন রেলস্টেশনের গণশৌচাগার ইজারা প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির গন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক 
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের গণশৌচাগার ইজারা প্রক্রিয়ায় সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর হঠাৎ মধ্যরাতে দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারেরা। তাদের অভিযোগ-রেলওয়ের ভেতরে প্রভাবশালী শ্রমিকলীগ নেতা কামাল পারভেজ বাদলের ইঙ্গিতে দরপত্র স্থগিত করে সুবিধাভোগী পক্ষকে সুযোগ দিতে চক্রান্ত চলছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই শ্রমিকলীগ নেতা কামাল পারভেজ জুলাই-আগস্টে ছাত্র জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ৫ আগস্টের পর কোতোয়ালী থানায় গ্রেফতারও হয়েছিলেন। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে ফ্যাসিস্ট কিছু সাংবাদিককে হাত করে, ফের রেলওয়েতে প্রভাব কাটাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। এমন একজনের প্রভাবে রেলওয়ে দরপত্র স্থগিত করায় বিস্মিত ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্টের কারণে বঞ্চিত ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা। 

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশল (ডিইএন-১) অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নতুন রেলস্টেশনের গণসৌচাগার ইজারা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ইজারায় অন্তর্ভুক্ত ছিল ৬টি টয়লেট, ৩টি ওজুখানা, ২টি প্রস্রাবখানা ও কয়েকটি বেসিন। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দরপত্রের শিডিউল বিক্রি হয় এবং ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল।

সেদিন দুপুরে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল পাহাড়তলী বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহিমের কার্যালয়ে দরপত্র বাক্স খোলা হয়। মোট সাতটি দরপত্র জমা পড়ে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স এম আর ইন্টারন্যাশনাল ৫ লাখ ৫ হাজার টাকার প্রস্তাব দেয়, যা অন্যদের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাবির মোটরস (২.৫ লাখ) এবং তৃতীয় ব্লু প্রিন্ট (২.২ লাখ)।
কিন্তু দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই রাত ১০টার দিকে বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহিমের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে দরপত্র কার্যক্রম ‘স্থগিত’ ঘোষণা করা হয়।তবে ওই চিঠিতে স্থগিতের কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদার মেসার্স এম আর ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সব নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশ নিয়েছি। দুপুরে উপস্থিত থেকে বাক্স খোলাও দেখেছি। সবার সামনেই যাচাই-বাছাই হয়েছে, ভিডিও আছে। অথচ রাতের আঁধারে হঠাৎ স্থগিতাদেশ! এটা স্পষ্ট দুর্নীতির অংশ। 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রেলওয়ে শ্রমিকলীগের স্টেশন শাখার সেক্রেটারি কামাল পারভেজ বাদল বহু বছর ধরে ওই গণশৌচাগারটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। তিনি নিয়মিত রাজস্ব না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি গাঁজা, ইয়াবা ও জুয়ার আসর পরিচালনা করে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। অথচ তার আয়কর রিটার্নে শূন্য আয় দেখানো হয়েছে, বলেন মাহবুবুর রহমান।

তিনি জানান, আগামী রবিবার তিনি দুদকের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে কামাল পারভেজ বাদলের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আয়কর ফাঁকির অভিযোগ দাখিল করবেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামাল পারভেজ বাদল রেলওয়ে কর্মকর্তাদের একটি অসাধু সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পদ থেকে আয় আত্মসাৎ করছেন। চট্টগ্রামের মাদারবাড়ীতে তার দুটি ফ্ল্যাট ও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে ওনি সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে গণশৌচাগারটি পরিচালনা করছেন। তিনবছর আগে একবার সরকারকে রাজস্ব দেয়া হয়েছিল। লিজ নবায়ন এবং দরপত্র আহবানের নিয়ম থাকলেও আওয়ামী শাসনের প্রভাব খাটিয়ে নিজের দখলে রেখে শৌচাগারের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এরপর থেকে কোনো রাজস্ব দিচ্ছেন না। কামাল পারভেজ বাদল অত্যন্ত প্রভাবশালী শ্রমিকলীগ নেতা। 

অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই শৌচাগারকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে গাঁজা, ইয়াবা ও জুয়ার আসর পরিচালনা করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অথচ তিনি কখনোই বাৎসরিক আয়কর প্রদান করেননি। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, কামাল পারভেজ বাদলের আয়কর নথিতে তিনি নিয়মিত ‘শূন্য রিটার্ন’ জমা দিতেন। সেখানে তার মোট সম্পদের ঘরে মাত্র ২৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

 তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রামের মাদারবাড়ীতে তিনি দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করে একত্রে একটি বিলাসবহুল আবাসনে পরিণত করেছেন। এছাড়া তথ্যসূত্রে জানা গেছে, তার ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে এবং নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে সম্পত্তি রয়েছে।

 রেলওয়ের ভেতরের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেলওয়ের বিভিন্ন ইজারা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। এবারও একই কৌশলে দরপত্র স্থগিত করে সুবিধাভোগী পক্ষকে সুযোগ দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দরপত্র খোলার পর বৈধ কারণ ছাড়া স্থগিত করা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস–২০০৮-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর পেছনে প্রভাবশালী শ্রমিকলীগ নেতার তদবির ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেলের প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞা বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্তের জন্য সাময়িক স্থগিত করা হয়। এটি সচরাচর প্রক্রিয়া। তদন্ত করে কোনো কিছু পাওয়া না গেলে যারা আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে থেকেই দরপত্রের যোগ্যবলে ঘোষণা করা হবে।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।