দীর্ঘ ছয় বছরের প্রস্তুতি এবং ১৬ মাসের অবকাঠামোগত কাজ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের বিভিন্ন আবহাওয়া ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ তথ্য ব্যবহার করে মাছের অবস্থান শনাক্তকরণ, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদান এবং উপকূলীয় এলাকায় আগাম সতর্কতা জোরদার করা যাবে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদ এলাকায় স্থাপিত ‘চীন–বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং’ বা ‘স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার’-এর উদ্বোধন করা হয়। ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সরকারের ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মীর হেলাল উদ্দিন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে চীনের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (এসআইও) এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ প্রকল্পটির অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়।
যদিও প্রকল্পটিতে কোনো সরাসরি আর্থিক চুক্তি হয়নি, তবে চীনা অংশীদার প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্যাটেলাইট ডাটা ফিসহ সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সহায়তার সম্ভাব্য মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বাজেট নয়, বরং উভয় পক্ষের সম্ভাব্য অবদানের একটি ধারণামূলক হিসাব।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রাউন্ড স্টেশনটি বর্তমানে ১১টি আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এসব স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত তথ্য গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে জাতীয় ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করা হবে।
এটি একটি বেসামরিক গবেষণাভিত্তিক ডাউনলিংক গ্রাউন্ড স্টেশন। এখানে কোনো আপলিংক সুবিধা নেই। কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, “প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেটসহ অবকাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করবে। এ কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরাসরি স্যাটেলাইট তথ্য গ্রহণের সুযোগ পাবে, ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হবে।”
তিনি আরও বলেন, ব্লু ইকোনমি, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নৌপরিবহন এবং উপকূলীয় উন্নয়নে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। দেশে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের ফলে শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা সমুদ্র ও মৎস্যসম্পদ–সংক্রান্ত রিয়েল-টাইম তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন।
আরএইচ
এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি শেওপেং এবং সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির ডেপুটি ডিরেক্টর অধ্যাপক ফু বিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ফলক উন্মোচনের পর অতিথিরা গ্রাউন্ড স্টেশন পরিদর্শন করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের মিলনায়তনে এ উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।