মাসুদ ফরহান অভি
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকেই তাঁর চিকিৎসাবিদ্যায় হাতেখড়ি ৭০'র দশকে শেষ দিকে। সেই থেকেই শুরু। মাঝপথে ঘটেনি কোনও ছন্দপতন। শৈশব থেকেই ছিল স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু করার দৃঢ়তা। ছাত্রজীবনে চরম মেধাবী এ তরুণ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের বেসরকারি চিকিৎসাখাতের মহীরুহ। অগণিত ডিগ্রী আর চিকিৎসাখাতকে ঢেলে সাজানোর নানা কসরত আয়ত্তে নিতে তিনি ছুটেছেন পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। ইরান-তুরান থেকে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের চিকিৎসা বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে নিয়েছেন অভিজ্ঞতা। বলছিলাম চিকিৎসাখাতের কিংবদন্তি ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হকের কথা।
শুধু নিজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেননি তিনি, হয়েছেন হাজারো চিকিৎসকের কর্মক্ষেত্র তৈরির কারিগর। চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন হসপিটাল, পার্কভিউ হসপিটাল, ন্যাশনাল হসপিটাল ও চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতপাতালসহ অসংখ্য হাসপাতাল গড়ে তোলার নেপথ্যে আছেন ডা. ফজলুল হকের প্রত্যক্ষ অবদান।
চট্টগ্রামে বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা বিস্তারে অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ডা. এ. কে. এম. ফজলুল হকের নাম আজ অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। তিনি চিকিৎসাকে শুধুই একটি পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের এক মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সরওয়ার কামাল বলেন, 'ডা. এ. কে. এম. ফজলুল হক চিকিৎসা জগতে একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। তিনি নিজে যেমন একজন ভাল মানের চিকিৎসক, তেমনি এই চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হাসপাতাল গড়ারও কারিগর। জনগণের কল্যাণে ডা. ফজলুল হক নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করছেন। তিনি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইরান, সৌদি আরব, কাতার, চীন, তুরস্ক, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করে চট্টগ্রামে মানুষের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে কাজ করে চলেছেন। তাঁর পরিচালনায় যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেসব শুধু অবকাঠামোগত নয়; মূল্যবোধ, পেশাদারিত্ব ও সেবার মানেও অতুলনীয়।'
১৯৫৫ সালে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলার দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত শিকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা, প্রয়াত জাফর আহমদ সিকদার ছিলেন একজন স্বনামধন্য সমাজসেবক। তাঁর মা প্রয়াত সাফিয়া বেগম ছিলেন একজন মহীয়সী নারী, দশ সন্তানের গর্বিত জননী প্রকৃত রত্নগর্ভা মা। এই পরিবারে ডা. ফজলুল হক ছিলেন পঞ্চম সন্তান। ডা. ফজলুল হকের ভাইদের মধ্যে চৌধুরী মমতাজ উদ্দিন কুতুবী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ভাই বজল আহমদ শিকদার ও মোহাম্মদ শাহজাহান সিকদার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর আরেক ভাই প্রয়াত মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া তাঁর ভাই মাহমুদুল হক ছিলেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। তাঁর আরেক ভাই আজিজুল হক ওসমানী ছিলেন সাংবাদিক, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। এছাড়া তাঁর ভাই আতাউল হক ওসমানী একজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইসলামী সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হক ১৯৭১-৭২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া মডেল হাই স্কুল থেকে। বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করে ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগেই এইচএসসি সম্পন্ন করেন। কৃতিত্বের ফলস্বরূপ তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৮২ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর গবেষণায় নিযুক্ত হন তিনি। পাড়ি জমান ইরানে। টানা পাঁচ বছর চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানান অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। এরপর রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে মেডিকেল আলট্রাসনোগ্রাফি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও স্বীকৃত সোনোলজিস্ট হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পার্কভিউ হসপিটাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চট্টগ্রাম বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশনের সভাপতি, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল (কক্সবাজার) লিমিটেড এবং চট্টগ্রাম মাল্টি প্রজেক্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল ডেন্টাল কলেজ এবং চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজের ট্রাস্টিজের বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সহ সভাপতি, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য, শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইনস্টিটিউটের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সদস্য, চিটাগাং আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হক অসংখ্য সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমেও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি কুতুবদিয়া সমিতি, চট্টগ্রামে সভাপতি, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (NDF) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান কে ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের (IBWF) সিনিয়র সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হক বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোক্তা হিসেবেও স্বীকৃত। তিনি লা মেট্রো লিমিটেড, ইনানী, কক্সবাজার উদ্যোগের চেয়ারম্যান, ফ্লোরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের এক্সিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হকের শ্বশুর এ.কে মাহমুদুল হক ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, লেখক, শিক্ষক নেতা, বহু প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক এবং চিটাগাং আইডিয়্যাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি বায়তুশ শরফ মাদ্রাসার অন্যতম উদ্যোক্তা এবং মাসিক দ্বীন-দুনিয়া পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। ডা. ফজলুল হকের শাশুড়ী নদল আফরোজ খানম ছিলেন জামালখান কুসুম কুমারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির সিনিয়র শিক্ষিক।
ডাঃ ফজলুল হকের সহধর্মিনী আমেনা শাহীন ডা. খাস্তগীর স্কুলের মেধাবী কৃতি ছাত্রী। তিনি এস.এস.সি পরীক্ষায় কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে ১ম স্থান অধিকার করেন। ডা. আমেনা শাহীন চিটাগং আইডিয়্যাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষিকা ও একাডেমিক ডিরেক্টর। তিনি চিটাগং ওমেন চেম্বার এন্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক। তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপিলিটন হাসপাতালের বোর্ড মেম্বার এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হকের ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর বড় মেয়ে ও মেজ মেয়ে চিকিৎসক হিসেবে আমেরিকায় প্র্যকটিস করছে। ছোট মেয়ে আমেরিকায় প্রি-মেডিকেলে অধ্যয়নরত।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ডা. এ.কে.এম. ফজলুল হক জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্বপালন করছেন।জামায়াতের হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম -৯ আসনে (কোতোয়ালি - বাকলিয়া) নির্বাচন করবেন তিনি।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।