একসময় তাঁর পরিচয় ছিল শিক্ষক হিসেবে। শ্রেণিকক্ষের ডায়াস ছেড়ে তিনি নেমেছিলেন রাজনীতির উত্তাল ময়দানে। ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি থেকে পৌর চেয়ারম্যান ধাপে ধাপে এগিয়েছেন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। হয়েছেন সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব। বিরোধী দলের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বহুবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করেছেন।
দীর্ঘ সেই রাজনৈতিক পথচলার পর এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সংসদ সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
একজন শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি—মির্জা ফখরুলের এই যাত্রা নিছক পদোন্নতির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ অধ্যায়।
ছাত্ররাজনীতি থেকেই রাজনীতির হাতেখড়ি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনার সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন। ছাত্রজীবনে সংগঠনের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
তবে রাজনীতি দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়নি। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতা ছেড়ে রাজপথে
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল। এরপর সরাসরি যুক্ত হন সক্রিয় রাজনীতিতে। দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে দায়িত্ব পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির। স্থানীয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসেন জাতীয় নেতৃত্বে।
সংসদ ও মন্ত্রিসভায়
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
রাজনীতির পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক দায়িত্বেও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
সংকটের সময়ে দলের অন্যতম মুখ
২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সে সময় বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও দলীয় বক্তব্যে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান মুখ। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়।
২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে থেকে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন অবস্থানের সময় দেশে থেকে দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল।
আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও কারাবরণ
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় বিরোধী দলের আন্দোলন। বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে সব মিলিয়ে তাঁর কারাবরণের সময়ও কম নয়। দীর্ঘ সময় কারাগারে থেকেও তিনি দলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
ফলে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যেমন যুক্ত হয়েছে সংসদ ও মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা, তেমনি যুক্ত হয়েছে বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও।
মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি
রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ২০২৬ সালে। জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ১৩ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায় পেছনে ফেলে তাঁর সামনে খুলে যায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার পথ।
অবশেষে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে সেই যাত্রা পূর্ণতা পায়। ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন যে মানুষটি, তিনিই আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে পৌরসভা, সংসদ, মন্ত্রিসভা ও রাজপথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো নতুন এক পরিচয়—‘মহামান্য’ রাষ্ট্রপতি।
ব্যক্তিজীবন
রাজনীতির বাইরে মির্জা ফখরুলের পারিবারিক জীবনও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে গড়ে উঠেছে। তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ঢাকায় একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
এই দম্পতির দুই কন্যা—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন; বর্তমানে ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
এসআই/দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।