মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
বৃহস্পতিবার দুপুরেও ঘরে ছিল স্বাভাবিক পরিবেশ। বৃদ্ধ বাবা সেকান্দার আলী বসেছিলেন দুই ছেলে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ও মোহাম্মদ মনসুর আলীর সঙ্গে। একসঙ্গে ভাত খেয়েছেন, কথা বলেছেন। এরপর দুই ভাই প্রতিদিনের মতো কাজে বেরিয়ে যান।
কে জানত, সেটিই হবে বাবার সঙ্গে তাদের শেষ খাওয়া।
পরদিন শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল গ্রিন শিপইয়ার্ডে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এলএনজি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসে প্রাণ হারান নয় শ্রমিক। তাদের মধ্যে ছিলেন আপন দুই ভাই নাসির ও মনসুর।
১৭ বছর ধরে একই শিপইয়ার্ডে কাজ করেছেন তারা। জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশাকেই বেছে নিয়েছিলেন দুই ভাই। একজন ছিলেন ইয়ার্ডের ইনচার্জ, অন্যজন সুপারভাইজার। কাজের জায়গায় যেমন পাশাপাশি ছিলেন, পরিবারের দায়িত্বও ভাগ করে নিয়েছিলেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।কিন্তু এক দুর্ঘটনাই থামিয়ে দিল দুই ভাইয়ের পথচলা।
দুই সন্তানের মরদেহ বাড়িতে ফেরার পর সেকান্দার আলীর ঘর এখন শোকে ভারী।
সেকান্দার আলী বলেন, দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে শিপইয়ার্ডে কাজ করতেন। তাদের আয়ে সংসার চলত। এখন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এই চিন্তাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় দশক ধরে একই কর্মস্থলে কাজ করছিলেন দুই ভাই। প্রতিদিনের মতো শুক্রবারও সকালে কাজে যান তারা।
নাসিরের বোন জামাই নূরুল আফসার জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে এমনটা কেউ কল্পনাও করেননি।
তিনি বলেন, সকালে হঠাৎ ফোনে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর সবাই ছুটে যান। সেখানে গিয়ে একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে পরিবারের কেউ যেন স্বাভাবিকভাবে কথাই বলতে পারছিলেন না।
মনসুর আলীর দুই মেয়ের মধ্যে কোনো ছেলে নেই। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন তাদের বাবা। তাই বাবার মৃত্যুতে শোকের পাশাপাশি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সংসার চালানোর প্রশ্নও।
মনসুরের বড় মেয়ে রুপা আক্তার বলেন, বাবার সঙ্গে আগের দিনও অনেক কথা হয়েছে। বাবাই ছিলেন তাদের সুখ-দুঃখের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। তার মৃত্যুর পর কীভাবে সংসার চলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
নাসিরেরও রয়েছে এক মেয়ে। দুই ভাইয়ের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন উদ্বিগ্ন স্বজনরা।
দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা দিতে দেরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মনসুরের মেয়ে রুপা আক্তার। তার দাবি, আহতদের কিছু সময় ইয়ার্ডের ভেতরেই রাখা হয়েছিল এবং সেখানে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সুবিধাও ছিল না।
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মালিকপক্ষ। আহতদের চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। গুরুতর আহত দুজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রোকার্স অ্যান্ড রিসাইকার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে সহায়তার কথা জানানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা ও তাদের পরিবারের জন্যও সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
/দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।