দক্ষিণ পূর্ব

টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা

ছবি সংগৃহীত

টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কক্সবাজারে ২৩ জন, চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা।

 

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬টি উপজেলার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত হয়েছে ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা। দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।

 

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও হাটহাজারীসহ অন্তত ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়ায়। উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে চার লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

 

সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আদালত, পৌরসভা, থানা ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। ডলু নদীর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন।

 

পাশের বাঁশখালী উপজেলায়ও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ৫০০ কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। বাহারছড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ভেসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

 

চন্দনাইশে শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাশিমপুর এলাকায় পানি ওঠায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

 

বন্যায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি ও মৎস্য খাত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ ধান, ৫৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৭ হাজার ৩৭৫টি পুকুর-দিঘি ও ৪৫টি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ এবং ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তবে মাঠপর্যায়ের আরেকটি জরিপে প্রায় ৯১ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছে।

 

পটিয়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও হাটহাজারীর শত শত মাছের খামার ও পুকুর প্লাবিত হয়েছে। হালদা নদীর রেণুপোনা লালন-পালনের পুকুরগুলোও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হালদাভিত্তিক মাছচাষ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক মাস মিঠাপানির মাছের সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে দাম বাড়তে পারে।

 

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের ছুটি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্গম এলাকায় স্পিডবোটে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৫ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনে চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।

 

বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার শনিবারের এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ পরে জানানো হবে।

 

এদিকে কক্সবাজারে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সেনাবাহিনী সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে উদ্ধার করেছে। বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

আরএইচ/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।