দক্ষিণ পূর্ব

তামান্না শারমিন: এ যেন আরেক পাপিয়া

sathi
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৫
পঠিত :
তামান্না শারমিন: এ যেন আরেক পাপিয়া

বিশেষ প্রতিনিধি 
চুলে রং, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী সুর-ভঙি। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে তামান্না শারমিনের সাম্প্রতিক ফেসবুক লাইভ দেখে যেন ভিরমি খেয়েছেন অনেকেই। সবার মনে পড়ে যায় সেই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির এক রাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আলোচিত নারী শামীমা নূর পাপিয়া-কে। 

একসময় আওয়ামী লীগের নারী নেত্রী পাপিয়া, আর এখন কথিত সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী পরিচয় দেওয়া তামান্না—দুজনেই যেন একই ছাঁচে ঢালাই হওয়া ‘ক্ষমতাধর নারী’র প্রতিচ্ছবি।

পাপিয়া ছিলেন যুব মহিলা লীগের নেত্রী। রাজনৈতিক পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল থেকে অস্ত্র-মাদক সিন্ডিকেটের জগত পর্যন্ত। ঠিক তেমনি তামান্না শারমিন, এক সময়কার ছাত্রলীগ নেত্রী, পরে চট্টগ্রাম যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর বাবরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি পান। অমিত মুহুরী নামের এক ভয়ঙ্কর অপরাধীর সঙ্গেও ছিল তার প্রেমের সম্পর্ক।

দুজনেরই কাহিনিতে উঠে আসে টাকার গরম, ক্ষমতার হুঙ্কার আর বেপরোয়া জীবনযাপন। পাপিয়া যেখানে বলতেন 'কাজ না হলে টাকা ছিটিয়ে কাজ করিয়ে নেবো', তামান্নার কণ্ঠেও যেন একই সুর-'১৪ দিনের মধ্যে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে জামাইকে নিয়ে আসবো।'

পাপিয়ার উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করা গ্ল্যামার ইমেজ। আর তামান্না শারমিনও পিছিয়ে ছিলেন না—টিকটক, ফেসবুক লাইভ, স্টাইলিশ পোশাক আর আগ্রাসী ভাষায় সামাজিক মিডিয়ায় তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন ‘লেডি ডন’ হিসেবে।

পাপিয়ার বিরুদ্ধে উঠেছিল দেহ ব্যবসা ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ। তামান্নার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক যুবককে প্রেম ও বিয়ের ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। একাধিক ‘বিয়ে’, আগের ঘরের সন্তান, কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সাজ্জাদের স্ত্রী দাবি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময়, বিতর্কিত নারীচরিত্র।

পাপিয়া অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত ছিলেন। তামান্নার ক্ষেত্রেও অভিযোগ আছে, তিনি সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। পুলিশকে হুমকি দেওয়া, নিজের ভিডিও দিয়েই সাজ্জাদের অবস্থান ফাঁস করে দেওয়া, মামলায় ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ এনে চাপ সৃষ্টি—এসব ঘটনায় তার অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট।

পাপিয়া ব্যবসার আড়ালে কোটি কোটি টাকা পাচার করে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, হোটেলে বিল দিয়ে তাক লাগিয়েছেন। তামান্নাও নানা সময়ে দুবাই যেতেন, বার ও ক্লাবের ডান্স পারফরম্যান্সে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। ‘মেকআপে বয়স লুকানো’ ও বিদেশি স্টাইল অনুকরণ, তাদের দুজনকে যেন বানিয়ে দিয়েছে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

পাপিয়াকে নিয়ে দেশজুড়ে যেমন আলোচনার ঝড় ওঠে, তামান্নার ক্ষেত্রেও তেমনই বিস্ময়, আতঙ্ক আর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুজনই যেন ক্ষমতা, অপরাধ ও সামাজিক মিডিয়ার সমন্বয়ে গঠিত নতুন ধারার নারী অপরাধী—যাদের গল্প বাস্তবতার চেয়েও রূপকথার মতো।

তবে একটা সময় গিয়ে ধরা পড়ে যায় সব। পাপিয়ার পরিণতি সম্পর্কে জানে পুরো দেশ। গত ১০ মে রাতে নগরীর চান্দগাঁও বারইপাড়া এলাকা থেকে তামান্না শারমিনকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে দিয়ে আপাতত ইতি টানা গেছে তামান্না অধ্যায়। এখন দেখার বিষয় জেলবন্দী তামান্না শারমিনের কপালেও কি 'পাপিয়ার' লিখন, না বেরিয়ে এসে আবারও ফেসবুকের পর্দায় হাজির হবেন। দেবেন নতুন কোনো হুংকার!

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।