দক্ষিণ পূর্ব

থেতলে গেছে পুরো শরীর, প্রাণ থেকে ও যেন মৃত

RAFIQ HYDER
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৫
পঠিত :
থেতলে গেছে পুরো শরীর, প্রাণ থেকে ও যেন মৃত
রফিক হায়দার: 

শরীর থেতলে গেছে, হাত-পায়ে ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন। তীব্র ব্যথায় ছটপট করছে। শুয়ে থাকাও যেন কষ্টকর। খানিকক্ষণ বসে, কিছুক্ষণ এ কাত আর কিছুক্ষণ ও কাত হয়ে শুয়ে দিনাতিপাত করছেন। তার মাঝে আবার চিকিৎসার অবহেলা। রোগীর এ্যাটেন্ডেন্সকেই পালন করতে হয় ডাক্তারের দায়িত্ব। 

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছে তিনজন স্কুলছাত্র। তাদের একজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, বাকি দুজন এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধ নয়—এটি আমাদের সমাজের মানবিকতার মৃত্যু ও ভয়ংকর অসহিষ্ণুতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

গত শুক্রবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে চোর সন্দেহে স্কুলছাত্র মাহিন (১৪) কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।  এসময় একই এলাকার রাহাত (১৬) ও মানিক (১৯) নামের দুজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। বর্তমানে তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মানিক: শুয়ে থাকতেও কষ্ট হয়

মানিকের বয়স মাত্র ১৯। স্থানীয় একটি স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলা, বিকেলে ক্রিকেট ব্যাট হাতে মাঠে নামা, ঘুরাফেরা এই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। পাশাপাশি কার ড্রাইভিং শিখতো সে। পরিবারে ভাইবোনের মধ্যে অন্যতম আদরের সে। মানিকের স্বপ্ন একদিন চাকরি করবে, সংসারে আলো ফিরাবে। কিন্তু জীবনের শুরুতেই চুরির অপবাদ। চোর সন্দেহে স্থানীয় লোকজন কোনো তদন্ত বা সত্য যাচাই ছাড়াই শুরু হলো বেধড়ক মারধর। মা বারবার চিৎকার করে বলছিলেন
“আমার ছেলে চোর না, ও আমার মানিক.." কিন্তু কেউ তার আর্তনাদ শোনেনি।

আহত মানিকের ভাই রাশেদ জানান, আমার ভাই তার বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে গেছিলো। সেখান থেকে ফিরতে ভোর হয়ে যায়। ভোরে তারা ফটিকছড়ি কাঞ্চননগরে পৌঁছায়। সেখানে তাদেরকে চোর সন্দেহে ব্রিজের সাথে বেঁধে পিটিয়ে আহত করা হয়। আমার ভাই চোর না। তাকে পিটিয়ে আহতকারীদের বিচার চেয়েছেন তিনি। 

মানিকের মা রোজি আক্তার জানান, আমি এতকিছু বুঝি না। আমার ছেলেকে যারা মারছে তাদের বিচার চাই। তিনি ছেলের বিচার পাওয়ার জন্য ফটিকছড়ি থানায় মামলা করতে গেলে মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন। পরে চট্টগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করেন। 

রাহাত: ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেন না...

মানিকের সঙ্গী রাহাতও স্কুলছাত্র। বয়স মাত্র ১৬। সেও স্থানীয় একটি স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র। গণপিটুনির রাতে সে-ও একইভাবে আহত। শরীরের নানা জায়গায় গুরুতর জখম। এখনো সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। মায়ের চোখের পানি থামছে না। শরীরের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। 

আহত রাহাতের ভাই আনোয়ার হোসেন সুমন জানান, আমার ভাই চোর ছিল না। তারা কক্সবাজার থেকে ফেরার সময় গণপিটুনির শিকার হয়। এখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। আমার ভাইয়ের হামলার বিচার চাই। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চিকিৎসার অবহেলার অভিযোগ করেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেই কারণে অচেনা কিশোরদের সন্দেহ হলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং পরে গণপিটুনি দেয়। এভাবে মারধর করা উচিত হয়নি।

ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর আহমদ বলেন, ঘটনার সপ্তাহখানেক আগে ওই এলাকায় কোনো চুরির ঘটনা ঘটেনি। তাঁরা নিজেরা বাঁচার জন্য চুরির কথা বলছেন। পূর্বের কোনো বিরোধ থেকে নাটক সাজিয়ে ওই কিশোরদের পেটানো হয়েছে। মামলা না নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে আহতদের সব বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তাই আরেকটা মামলা নেয়নি বলে জানান তিনি।  

প্রসঙ্গত, গভীর রাতে সাগর আলী তালুকদার বাড়িতে চুরির চেষ্টা চালায় একদল চোর। এসময় এলাকাবাসী টের পেয়ে ধাওয়া করে তিন জনকে আটক করে। পরে উত্তেজিত জনতা বেধড়ক মারধর করলে ঘটনাস্থলেই মাহিন মারা যায়। আহত দুই যুবককে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ফটিকছড়ি থানা পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নোমান ও আজাদ নামের দুই যুবককে আটক করেছে। গত শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোতাসিম বিল্লাহর আদালতে জবানবন্দি দেন দুই আসামি। আসামিরা হলেন আজাদ হোসেন (৩৬) ও মোহাম্মদ নোমান (৩৭)। এর মধ্যে নোমান গ্রাম্যডাক্তার ও আজাদ গাড়িচালক। জড়িতদের   গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলমান।

আদালত সূত্র জানা যায়, জবানবন্দিতে আসামি আজাদ হোসেন বলেন, ছয় দিন আগে এলাকায় কিছু কবুতর চুরি হয়। সেই চুরির অপবাদ দিয়ে ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে আসা মাহিনসহ তিনজনকে ধরার চেষ্টা করেন। ওই সময় আজাদ, ফাহাদ, ইমন, আনোয়ার, মুন্না, শাওনসহ ছয়জন ছিলেন। তিন কিশোরকে ধাওয়া দিলে তারা পাশের একটি বাড়ির ছাদে উঠে যায়। পরে তাদের ধরে এনে এলাকার একটি সেতুর সঙ্গে বাঁধা হয়। বাধাঁ অবস্থায় তাদেরকে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে মাহিনের মৃত্যু হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন, নাজিম উদ্দিন, তানভীরসহ অন্তত ৪০ জন তিন কিশোরকে মারধর করতে থাকেন। কারও হাতে লাঠিসোঁটা আর কারও হাতে বিদ্যুতের তার। আর কেউ কিলঘুষি মারেন। মারধরের এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মাহিন। নিশ্বাস আছে কি না, নাকে হাত দিয়ে দেখা হয়। পরে সেখানে থাকা পল্লিচিকিৎসক নোমান নিশ্চিত করেন মাহিন মারা গেছে। এরপর হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়া সবাই পালিয়ে যায়। 

আরেক আসামি মোহাম্মদ নোমানও তাঁর জবানবন্দিতে  স্কুলছাত্র মাহিনসহ তিনজনকে মারধরের কথা স্বীকার করেন। তিনিই মাহিনের মৃত্যুর বিষয়টি উপস্থিত সবাইকে জানান। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্য আসামিদের নামও উল্লেখ করেন।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।