দক্ষিণ পূর্ব

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু

sathi
প্রকাশ : ১ মার্চ ২০২৫
পঠিত :
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু

ডেস্ক রিপোর্ট 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।  জাতীয় নাগরিক পার্টি (ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি- এনসিপি) নামে একটি  নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়েছে।রাজধানীর  মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটা এই দলের দৃশ্যত নেতৃত্বে আছেন সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও সাবেক ডাকসু নেতা আখতার হোসাইন।

নতুন এই দলের কমিটিতে মোট ১৫১টি পদ রয়েছে। এরমধ্যে  জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদে রয়েছেন ডা. তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার নিভা। মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) পদে রয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ এবং মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) পদে রয়েছেন সারজিস আলম। মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ। 

কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন, আর সেই আন্দোলনেই কর্তৃত্ববাদী সরকারের দমন-পীড়ন। সহস্র মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে। নাহিদ ইসলামের চ্যালেঞ্জ শুরু গেল বছরের জুন থেকেই। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নামা নাহিদ হয়তো চিন্তাও করেননি এক সময় তার ঘাড়েই বর্তাবে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এদেশের মানুষের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারী শাসকের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার। ৩রা আগস্ট ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত শহীদ বেদি থেকে যেই চ্যালেঞ্জ নাহিদ নিয়েছিলেন সেটি সফলতা লাভ করে দুইদিনের মাথায়। ২৬ বছর বয়সী নাহিদ ৫ই আগস্টের পর দেশের স্বার্থে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে গিয়েছিলেন। সাড়ে ৬ মাস দায়িত্ব পালন শেষে প্রজন্মের স্বার্থে আবারো ফিরে এসেছেন রাজপথে। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তিনি ও তার সহযোদ্ধারা। 

রাজনীতির নতুন যাত্রায় নাহিদ ইসলাম ও তার সহযোদ্ধারা কতোটুকু সফল হবেন সেটি সময়ই বলে দেবে। কিন্তু গতকালের বিশাল সমাবেশ থেকে অন্তত জনতার রায় ছিল নাহিদদের প্রতি। যেই জনতা নাহিদকে ইমাম মানেন। সেই জনতাকেই নাহিদ বললেন বৈধতা। নবযাত্রায় নাহিদ বলেছেন, এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল সামনের কথা বলতে চাই। পেছনের ইতিহাস অতিক্রম করে বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা বলতে চাই। জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগান ‘তুমি কে আমি কে, বিকল্প বিকল্প’, সেই স্লোগান থেকেই আজ বিকল্প তৈরির সুযোগ এসেছে। 

তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে বিভাজনের রাজনীতি করে জনগণ ও রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে সেই রাজনীতি ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশকে আর কখনো বিভাজিত করা যাবে না। এদেশে আর ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই হবে না। আমরা বাংলাদেশকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করবো। 

নাহিদ বলেছেন, জনগণের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি। হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় বঙ্গীয় বদ্বীপের জনগোষ্ঠী হিসেবে এক সমৃদ্ধ ও স্বকীয় সংস্কৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রায় ২০০ বছরের বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে। তবে শোষণ ও বৈষম্য থেকে এ দেশের গণমানুষের মুক্তি মেলেনি। ফলে দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের জনগণকে বার বার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত  তৈরি করতে পারিনি; বরং বিগত ১৫ বছর দেশে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।

এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি। জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিল, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।

হাজার হাজার জনতাকে সামনে রেখে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্যদিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবো। 

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে, আমরা কৃষি-সেবা-উৎপাদন খাতের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই যেটি হবে স্বনির্ভর, আয়-বৈষম্যহীন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল। আমাদের অর্থনীতিতে সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না, বরং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে আমাদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আমরা বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ করবো। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবো এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে জোর দিয়ে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি টেকসই, আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলবো। 

বক্তব্যের শেষেও ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে নাহিদ।বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ। তিনি ডাক দেন- একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে, এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকারের সংগ্রামই হবে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। যেখানে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। তিনি বলেন, এখনই সময় নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার।

জুলাই আন্দোলনে নাহিদ যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সেটির প্রমাণও মেলে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে। যেখানে হাজির ছিলেন- বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকিসহ বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার হয়ে রাজপথে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি। উপস্থিত ছিলেন, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা। মঞ্চ থেকে বারবার ঐক্যের ধ্বনি তুলেছেন নেতারা। রাজনৈতিক দলগুলোকে সামনে রেখে দাবি তুলেছেন, নতুন সংবিধান ও গণপরিষদ নির্বাচনের। 

এদিন নতুন দলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণায়ও ছিল চমক। যেটি ঘোষণা করেন ৫ই আগস্ট পুলিশের গুলিতে শহীদ ইসমাইল হোসেন রাব্বীর লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করা তার দুই বোনের একজন মীম আক্তার। সেদিন শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে মীমরা ভাই হত্যার যে বিচার চেয়েছিল সেটি নাড়া দিয়েছে বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে।

 মীম আক্তার গতকালকের মঞ্চ থেকে বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক হিসেবে আমি গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেনের নাম ঘোষণা করছি। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণার পর দলের আংশিক অর্গ্যানোগ্রাম পড়ে শোনান সদস্য সচিব আখতার হোসেন। 

অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ৬ বছর বয়সী জাবির ইব্রাহীমের বাবাও এনসিপি’র প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। মঞ্চ থেকে বারবার নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসে এদেশে আর পরিবারতন্ত্র চলবে না। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমারের ছেলেও একদিন দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। তারা বলেন, আজকের দল ঘোষণাও কোনো এলিট শ্রেণির কথায় হয়নি।




 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।