বিশ্বের জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পে বাংলাদেশ দ্রুতই হারানো শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে এ খাতে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ও নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করে ‘গ্রিন লাইসেন্স’ অর্জন করতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পিএইচপি শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইয়ার্ডসহ তিনটি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শিপ রিসাইক্লিং ইউনিটকে শতভাগ কমপ্লায়েন্ট ও পরিবেশবান্ধব হতে হবে। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। বর্তমানে দেশে ৩১টি গ্রিন লাইসেন্সধারী শিপ রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা এ খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন। যারা নতুন করে এ খাতে বিনিয়োগ করতে চান, সরকার তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা দেবে। তবে গ্রিন লাইসেন্স ছাড়া কাউকে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, একসময় শিপ রিসাইক্লিং শিল্পকে পরিবেশদূষণ, শ্রমিক শোষণ ও অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মেনে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জাহাজ পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের এই শিল্প নতুনভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করছে।
বাংলাদেশের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে শিল্পমন্ত্রী বলেন, দুই বছর আগেও বিশ্বের মোট জাহাজ পুনর্ব্যবহারের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই বাংলাদেশে সম্পন্ন হতো। সাময়িকভাবে সেই অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়ে গেলেও দ্রুতই বাংলাদেশ আবারও বিশ্বের শীর্ষ শিপ রিসাইক্লিং দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, শিপ রিসাইক্লিং খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি জানতে এবং সমাধানের পথ খুঁজতেই তার এই সফর। ব্যবসায়ীদের আইনগত, নীতিগত কিংবা প্রশাসনিক কোনো জটিলতা থাকলে সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায় ১৫০টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড চালু থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৪০টি। একইভাবে ২০২১ সালে দেশে ২৮০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জাহাজের সংকট এবং অভ্যন্তরীণ নানা কারণে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৩টিতে।
দেশের শিল্পকারখানায় চলমান গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় চাইলেই গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, তবে সরকার দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাব্য উপায় খুঁজে বের করতে বিভিন্ন ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনা করছে। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সরকার গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে।
পরিদর্শনকালে শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন, সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।