দক্ষিণ পূর্ব

বিএনপির কার্যালয়ের ভেতরেই র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যা, নেপথ্যে সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন

মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারী ২০২৬
পঠিত :
বিএনপির কার্যালয়ের ভেতরেই র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যা, নেপথ্যে সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন
বিশেষ প্রতিনিধি 
সীতাকুণ্ডের এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। আল মামুন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা। ইয়াসিন এলাকার আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক। যারা প্লট কিনেছেন তারাই এ দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এ দুটি সমিতিতে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছেন।

গত ২ জানুয়ারি সলিমপুরে খুন হন ইউনিয়ন শ্রমিক দলের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি মীর আরমান। তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়। গত ১৪ মাসে এলাকাটিতে চারজন খুন হয়েছেন। পুলিশ বলছে, সব কটি খুনের পেছনে রয়েছে পাহাড়ি এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখা।

এলাকার বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনকে সরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরের দখল নিতে গত বছরের ৫ আগস্টের পর হামলা চালান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) রোকন উদ্দিনের বাহিনী। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর। কিন্তু ইয়াসিন বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা পেরে উঠছেন না। কাজী মশিউররা রয়েছেন জঙ্গল সলিমপুরের সলিমপুর অংশে আর ইয়াসিন রয়েছেন আলীনগরে।

আলীনগরের স্বঘোষিত রাজা ইয়াসিন

জীবিকার সন্ধানে নোয়াখালী থেকে কয়েক বছর আগে ছোটভাই ফারুকসহ চট্টগ্রাম আসেন ইয়াসিন। এসে প্রথমে কিছুদিন সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন চট্টগ্রাম শহরে। থাকতেন চট্টগ্রাম নগরের এক বস্তিতে। এরপর কিছুদিন চাকরি নেন একটি জুট মিলে। আরও কিছুদিন পর সীতাকুণ্ডের সলিমপুরের জঙ্গল সলিমপুরে একটি ঘর ভাড়া নেন। সেখানে নোয়াখালী থেকে কিছু সন্ত্রাসী এনে রাখতেন। এরপর পার্শ্ববর্তী দুর্গম পাহাড়ের একটি অংশ কেটে বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও সন্ত্রাসী ও দাগী আসামিদের নিয়ে আসেন সেখানে। গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। শুরু করেন দেদারসে পাহাড় কাটা। পাহাড় কেটে একদিকে মাটি এবং অন্যদিকে জায়গা বিক্রি করতেন। ফলে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান দুই ভাই। বিশাল একটা এলাকার নাম দেন আলীনগর। বাংলাদেশ থেকে করে নেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

‘আলীনগর’ বাংলাদেশের ভিতরে অবস্থান হলেও দেশের কোন আইনই সেখানে কার্যকর ছিল না। সেখানকার অধিবাসীরা চলত রাজা ইয়াসিনের নিজস্ব আইনে। আলীনগরের প্রবেশের তিনটি পথ ছিল। তিনটি পথেই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতেন তার নিজস্ব সিকিউরিটির সদস্যরা। বাইরের কোন লোক ভিতরে প্রবেশ করতে পারতেন না। ভিতর থেকেও কেউ বাইরে যেতে পারতেন না। যতক্ষণ রাজার অনুমতি না পেতেন। 

বসবাসকারীদের কোন অতিথি আসলে তাদের ভোটার আইডি কার্ড অথবা জন্ম নিবন্ধন কার্ড নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। জমা দিতে হত সাথে আনা এন্ড্রয়েড ফোন। এখানে বসবাসকারীদেরও কেউ এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারতেন না। আর যারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা অর্থাৎ যারা জায়গা কিনে বসবাস করছেন তাদের ইয়াসিনের স্বাক্ষর করা বিশেষ পাস দেওয়া হত। পাস দেখিয়ে তারা ভিতর থেকে বাইরে ও বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশ করতে পারতেন। এই রাজ্যের কেউ কখনো থানা বা অন্য কোথাও কোন অভিযোগ নিয়ে যেতে পারতেন না। সেটা যত বড় অপরাধ হোক না কেন বিচার হত ইয়াসিনের আদালতে।

জানা যায় , চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এটির অবস্থান হলেও এটি অনেকটা নগরের ভেতরেই। এর পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা। লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় বছরের পর বছর ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলমান রয়েছে।

এদিকে  নিহত র‌্যাব কর্মকর্তা নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার।জানাযা মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র‌্যাব-৭ এর প্রধান  কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।এতে র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ও প্রশাসনের।বিভিন্ন স্থরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 
জানাযা শেষে সাংবাদিকদের সাথে র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান কথা বলেন।সেখানে তিনি জঙ্গল সলিমপুর থেকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যে কোন মূল্যে উচ্চেদের ঘোষণা দেন।

 র‌্যাব ডিজি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর একটি সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং যারা অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, তাদের নির্মূল করা হবে। অবৈধ কর্মকাণ্ডের এই আস্তানা আমরা ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেব এইটুকু কথা আপনাদের দিতে চাই।

হামলায় নিহত র‌্যাব সদস্যকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে একেএম শহিদুর রহমান বলেন, সুবেদার মোতালেব শহীদ হয়েছেন। যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের আমরা অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে আসব। বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে যেন তাদের শাস্তি নিশ্চিত হয়, সেটি যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।