দক্ষিণ পূর্ব

মা, বাথরুমে যাব না - চমেকের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে শোনা যায় যে কান্না

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৭ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
মা, বাথরুমে যাব না - চমেকের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে শোনা যায় যে কান্না

ছবি

নোয়াখালী থেকে আসা মুন্নি বেগম তার ৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে চমেকে ভর্তি হয়েছেন। মেয়েটার অপারেশন হয়েছে কাল। ডাক্তার বলেছে, 'বার বার টয়লেটে যেতে হবে, ইনফেকশন যেন না হয়।' মা মেয়েকে কোলে নিয়ে শৌচাগারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন। ভেতরে পানি নাই, ফ্লাশ নাই, বেসিন ভাঙা। মেঝেতে বর্জ্য। নাক চেপে ধরেও গন্ধটা ঠেকানো যায় না। 

 

মেয়েটা মায়ের গলা জড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, 'মা, বাথরুমে যাব না। ব্যথা করুক, তবু যাব না।'এই একটা বাক্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গোটা ব্যবস্থার ছবিটা ধরা পড়ে।


সংখ্যা বাড়ছে, মানবতা হারাচ্ছে এখানে

 

২০২০ সালে চমেকে প্রতিদিন ভর্তি হতো ৫৩৮ জন। ২০২৫ সালে সেটা ৮২৯ জন। ৫ বছরে রোগী প্রায় ৬৫ শতাংশ। কিন্তু যেখানে ৩ শিফটে ৯ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকার কথা, আছে ৪ জন। ক্লিনার নাই। ওয়ার্ডবয় দিয়েই সব চলছে।  প্রতিটা ওয়ার্ডে ৬টা করে শৌচাগার। কিন্তু একটাতে তালা, একটা বন্ধ। বাকিগুলোতে পানির কল নাই, প্রস্রাবের ব্যবস্থা নাই, দরজা ভাঙা, ফ্লাশ অকেজো। রোগী বাড়ছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫৭১ জন। বাড়েনি শুধু মৌলিক সম্মানটুকু—পরিষ্কার একটা বাথরুম।

 

কালুরঘাট এলাকার আশরাফ দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,'সরকারি হাসপাতাল হলে যা হয়। কষ্ট করে ব্যবহার করছি।'পাশে থাকা আরেক রোগীর স্বজন বললেন, 'কষ্ট করে? ভাই, মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে, কষ্ট কিনতে না। যে মানুষটা পেটের অপারেশন করে এসেছে, সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাবে ভাঙা দরজার শৌচাগারে। সেখানে দাঁড়িয়ে তার কাটা জায়গায় ইনফেকশন হবে। ডাক্তার আবার কাটবে। এটাই কি চিকিৎসা?'

 

ডাক্তারও লজ্জা পান এখানে। মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার নাম প্রকাশ না করে বললেন সোজা কথা, 'অপরিচ্ছন্ন বাথরুমে সংক্রমণ ছড়ায়। রোগী সুস্থ হওয়ার সময় দীর্ঘায়িত হয়। এভাবে রোগীদের কষ্ট দেখতে অনেক খারাপ লাগে।মানে যে রোগী ৭ দিনে সেরে বাড়ি যাওয়ার কথা, সে ১৫ দিন থাকবে। এতে ওষুধ, স্বজনের খাওয়া—সব খরচ ডাবল। গরীব মানুষটা পথে বসবে।

 

একটি ওয়ার্ড সরবরাহকারী মো. নুরুল কবির বলেন, 'পানির কল, বদনা সব দিয়েছি। রোগীরা ভেঙে ফেলে, নিয়ে যায়। লোকবল নাই।'তখন পাশে থাকা আব্দুল্লাহ আসাদ নামে এক রোগী জবাব দিয়ে বসলেন, 'ভাই, রোগী বদনা চুরি করে না। ক্ষুধা, অভাব, আর অব্যবস্থাপনা মানুষকে অস্থির করে রেখেছে এখানে। চুরি করার মানসিকতা কারও নেই৷ চুরি করলে বাইরের লোক এসে চুরি করবে। এটা নিরাপত্তাহীনতাকেই নির্দেশ করছে।

 

মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেছেন, শিগগির এসব সমাধান হবে। কাজ চলমান আছে।যদিও কাজ চলমান—এই কথাটা চমেকে আসা মুন্নি বেগমের মতো প্রতিটা মায়ের কাছে অভিশাপের মতো শোনায়। কারণ তার ৮ বছরের মেয়েটা আজ রাতে আবার বলবে, 'মা, হাসপাতালের বাথরুমে যাব না।'

 

চট্টগ্রামের বাসিন্দা মাসুদ আলম বলেন, এটা একটা দেশের গল্প। যেখানে পদ্মা সেতু হয়, মেট্রো চলে, স্যাটেলাইট উড়ে। আর হাসপাতালের ওয়ার্ডে মা-মেয়ে বর্জ্যের গন্ধে নাক চেপে কাঁদে। ৮২৯ জন রোগী মানে ৮২৯টা পরিবারের শেষ ভরসা। তাদের পায়খানা-প্রস্রাবের জায়গাটুকু যদি আমরা সম্মানের সাথে দিতে না পারি, তাহলে কিসের উন্নয়ন?চমেকের দেয়ালে লেখা আছে—'সেবাই পুণ্য'। কিন্তু ওই দেয়ালের পাশের শৌচাগারের দরজাটা ভাঙা। পুণ্যটা ওখানেই আটকে গেছে। 

 

এমএ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।