দক্ষিণ পূর্ব

রাউজানে অস্ত্রের মহড়ায় স্তব্ধ জনপদ

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
রাউজানে অস্ত্রের মহড়ায় স্তব্ধ জনপদ

ছবি সংগৃহীত

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৩১ মে চট্টগ্রামে এসে বলেছিলেন, 'রাউজান রাষ্ট্রের বাইরে নাকি।' তাঁর সেই বক্তব্যের ১৩ দিনের মাথায় ১৩ জুন পাহাড়তলী বাজারে দিন-দুপুরে সংঘটিত হয় নরকীয় খুন। পাঁচজন বন্দুকধারী অটোরিকশা থেকে নেমে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। মাথার মগজ বেরিয়ে গেল রাস্তায়। সিসিটিভিতে ধরা পড়ল তিনজনের হাতে পিস্তল, দুজনের হাতে লম্বা আগ্নেয়াস্ত্র। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজান যেন খুনের খাতা খুলে বসেছে।

 

২৫টি লাশ, দেড় বছরের হিসাব

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত রাউজানে খুন হয়েছে ২৫ জন। এর মধ্যে ১৭টি হত্যাকাণ্ডই রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা পুলিশের।

 

একই সময়ে এই উপজেলায় ঘটেছে ১০টির বেশি গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। স্থানীয়রা বলছেন, ২ মাসে অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহতদের বড় অংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।

 

১৩ জুন, দুপুর দেড়টা। রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী থেকে সিএনজি নিয়ে চৌমুহনী বাজারে ওষুধ কিনতে এসেছিলেন মাসুদুল। পিছু পিছু এল আরেকটি অটোরিকশা। পাঁচ থেকে সাতজন নেমেই গুলি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও গুলি চলতে থাকে।

 

মাসুদুলের বড় ভাই, বেতাগী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী বাদী হয়ে মামলা করেন এ ঘটনায়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে ‘আলোচিত সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ রায়হানকে। তার বিরুদ্ধে খুনসহ ১৫টির বেশি মামলা আছে। মামলায় নাম উঠেছে আরও ১০ জনের, অজ্ঞাত আরও ৮ জন। র‍্যাব এ ঘটনায় বাঘাইছড়ি থেকে আসামী আইয়ুবকে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে।

 

রাউজানের খুনগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে অটোমেটিক, সেমি-অটোমেটিক অস্ত্রের ব্যবহার। দিনে-দুপুরে বাজারে গুলি, বাড়িতে ঢুকে হত্যা, চলন্ত গাড়িতে হামলা—সবই এখন নিয়মিত চিত্র।

 

পুলিশ ১০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, 'সশস্ত্র দলগুলো প্রকাশ্যে ঘোরে। সবাই জানে তারা কারা, কিন্তু আক্রমণের ভয়ে কেউ মুখ খোলে না।'

 

হত্যার পেছনে কারণ কী? 

 

পুলিশ ও স্থানীয়দের মতে তিনটি মূল ইস্যু। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, এবং পাহাড় ও নদীর বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। মাসুদুল হত্যার ক্ষেত্রেও পুলিশের ধারণা, কর্ণফুলী নদীর বালুমহালের বিরোধই মূল জের। তিনি আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

 

বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকেই খুনের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। এক পক্ষ চট্টগ্রাম-৬ আসনের বিএনপি এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী। আরেক পক্ষ দলের সাবেক উত্তর জেলা আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের। দুই পক্ষ একে অপরকে দোষ দিচ্ছে শুরু থেকেই। ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বড় সংঘর্ষের পর বিএনপি উত্তর জেলার আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে, গিয়াস উদ্দিনকে ভাইস-চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তারপরও রক্তপাত থামেনি।

 

স্থানীয় সচেতন কয়েক ব্যক্তি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পরও পাহাড়তলীর খুন প্রমাণ করে রাষ্ট্রের দৃশ্যমানতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। পুলিশ বলছে ‘অভিযান চলছে।' চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলম বলেন, 'যত বড়ই সন্ত্রাসী হোক, ছাড় নেই।' তিনি দাবি করেন, সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং আগে বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ির ভৌগোলিক অবস্থান সন্ত্রাসীদের জন্য সুবিধাজনক। সেটা তারা ব্যবহার করছে।'

 

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মাকসুদুল হত্যার পর মামলা হতেই সময় লেগেছে দুইদিন। ভারি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, মার্ডারে জড়িত সবাই হয়নি গ্রেপ্তার। রাউজানে এখন সন্ধ্যার পর রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায় অনেকটাই। দোকান বন্ধ হয়ে যায় দ্রুত। অভিভাবকরা সন্তানদের বাইরে পাঠান না। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'মনে হয় এখানে প্রশাসন নেই। চাঁদাবাজি আর সহিংসতার ভয়ে সবাই আতঙ্কে। রাজনৈতিক নেতারা সংসদে, মাঠের মঞ্চে খুনের বিচার চাইছেন। কিন্তু খুন হচ্ছে নিজেদের গ্রুপিংয়ের কারণে।

 

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি জানান, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়। তিনি এখন কারাগারে। তার পতনের পর তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতাই রাউজানকে অস্থিতিশীল করেছে। ২৫টি লাশ, সাড়ে তিন শ আহত, ভারি অস্ত্র হাতে শোডাউন চলছেই। তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিকই বলেছিলেন, রাউজান রাষ্ট্রের বাইরে না। তাহলে প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র কবে রাউজানের দায়িত্বটা বুঝে নেবে? নাহলে পাহাড়তলীর পরের গুলিটা কার কপালে, সেটা কেউ জানে না। শুধু জানে, খুনের খাতাটা এখনো খোলা।

 

জেআর /দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।