রাতভর টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আবারও অবনতি হয়েছে। শনিবার কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও রোববার ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রাতে আরও তীব্র আকার ধারণ করলে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন করে পানি বাড়ে। কোথাও কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে, কোথাও আবার ঘরের ভেতরে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে। লাখো মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, পাঁচ জেলায় এ পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জনে।
চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। এ দুই উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এখনও পানিবন্দি। জেলার ১৬টি উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়নে ৬ লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত অবস্থায় রয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ২৮১টি বসতঘর, ২১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১৪৫টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা এলাকায় দেখা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ত্রাণবাহী যানবাহন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বন্যার পানিতে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার ত্রাণ নিতে দেখা গেলেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনও সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসুল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল ও পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর এখনও পানির নিচে। অসংখ্য কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অনেকে বাড়ির উঁচু অংশ কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
চাম্বল ইউনিয়নের বাসিন্দা হারুন আল রশীদ বলেন, *"দাদার আমলের মাটির বাড়ির দেয়াল ভেঙে পড়ছে। শনিবার পানি কমেছিল, কিন্তু রোববার বিকেল থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে। ঘর ভেঙে গেলে আমরা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ব।"
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, *"শনিবার পানি কিছুটা কমলেও রাতের বৃষ্টিতে আবার বেড়েছে। বেশিরভাগ এলাকায় নৌকা ছাড়া যাতায়াত সম্ভব নয়। পানি নামলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নতুন করে জীবনযুদ্ধ শুরু করতে হবে।"
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, এওচিয়া, ছদাহা, সোনাকানিয়া, ঢেমশা, খাগরিয়া, চরতী ও আমিলাইষ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। অনেক সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও বাড়ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, *"পানি ধীরে ধীরে নামছে। তবে ডলু নদীসংলগ্ন নিচু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। দুর্গম এলাকায় নৌকায় করে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।"
লোহাগাড়া সদর, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনও প্লাবিত। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আলমগীর বলেন, *"সরকারি ত্রাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। শিশুদের দুধ ও বয়স্কদের ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।"
চন্দনাইশেও নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় শঙ্খ নদীসংলগ্ন নিচু এলাকায় পানি বাড়ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান জানান, উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১৪৫ মেট্রিক টন চাল, ১ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২০০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারে ১৬০ মিলিমিটার এবং আমবাগান পর্যবেক্ষণাগারে ১৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা সুমন সাহা জানান, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ হালকা থেকে মাঝারি এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে এবারের বন্যায় প্রায় ৪০ কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রাণিসম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২২ হাজার ৬০০ মানুষ অবস্থান করছেন। পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৭ হাজার ৫৫ জন।
এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৫৫৭ টন চাল ও ৩০ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আরও ৫৬৫ টন চাল, ৮৮ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার ৩৫০ বান্ডিল ঢেউটিনের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, *"দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছেন।"*
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের তিনটি নদীর পাঁচটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
এছাড়া আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম, ফেনী, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রংপুরসহ কয়েকটি জেলার নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।