সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার ফেসবুক রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে সমালোচনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের একটি বড় অংশ ওই শিক্ষিকার পাশে দাঁড়িয়েছেন। একই সঙ্গে হাজারো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে ভিডিও প্রকাশ করে অভিনব সংহতি প্রকাশ করছেন।
ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালকে ঘিরে। গত ২৩ জুলাই তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় ধীর পায়ে হাঁটতে দেখা যায় তাকে। ভিডিওতে ব্যবহার করা হয় জনপ্রিয় গান ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ এবং ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’।
ভিডিওটি প্রকাশের পর একাংশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ভিডিওতে অশ্লীলতা ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গির অভিযোগ তুলে সমালোচনা শুরু করেন। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
তবে এরই মধ্যে ভিন্ন চিত্রও সামনে আসে। দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষিকা একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করতে শুরু করেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, কর্মস্থল কিংবা ব্যক্তিগত পরিবেশে ধারণ করা এসব ভিডিওর মাধ্যমে তারা বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি জানান।
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের ভাষ্য, শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও একজন শিক্ষক প্রথমত একজন মানুষ। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত অনুভূতি, নান্দনিকতা ও সৃজনশীল প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে সম্মান জানাতেই তারা এ উদ্যোগ নিয়েছেন।
শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লেখেন, “একজন শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ উদযাপন করার অধিকার আছে, তেমনি কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকারও রয়েছে। শিক্ষক মানেই কোনো নিরাসক্ত যন্ত্র নন। যা অশ্লীল তা শুধু শিক্ষকের জন্য নয়, সবার ক্ষেত্রেই অশ্লীল। আর যা শালীন ও সুন্দর, তা কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”
মাদারীপুরের সহকারী শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, “বিউটি রাণী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রাণী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।”
কুমিল্লার শিক্ষিকা লায়লা নূর পিংকি বলেন, “ডিজিটাল এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে দিয়েছে, যেখানে অন্যায় হবে সেখানেই শিক্ষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানাবেন। সমালোচনা করুন, তবে তা হোক যৌক্তিক।”
পঞ্চগড়ের শিক্ষিকা ফেরদৌস লিখেছেন, “এরপর শাড়ি পরেই দেব শিক্ষকের সেই ভাইরাল নাচ।” অন্যদিকে চট্টগ্রামের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিক প্রশ্ন তুলেছেন, “শিক্ষক যদি হাসেন, সাজেন, ভ্রমণে যান কিংবা ছবি পোস্ট করেন—সবই যদি সমস্যা হয়, তাহলে শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি মানুষ হওয়ার অধিকারও হারিয়ে ফেলতে হবে?”
সাংবাদিক ঝর্না মনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, বিউটি রাণী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও নাচ, গান ও আবৃত্তিতে অংশ নিতেন।
শিক্ষক দীপা মণ্ডল লেখেন, “শিক্ষকদের নাচ-গান ও অভিনয়ে দক্ষ হতে বলা হয়, যাতে শিক্ষার্থীদের আনন্দের সঙ্গে পাঠদান করা যায়। অথচ একজন শিক্ষিকা শাড়ি পরে একটি সাধারণ ভিডিও প্রকাশ করলেই কেন এত সমালোচনা?”
আরেক শিক্ষিকা তন্দ্রা তনু মন্তব্য করেন, “এখনও অনেকে মনে করেন, প্রাথমিকের শিক্ষক মানেই অভাবের প্রতীক। তাই কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা পরিচ্ছন্ন পোশাকে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ালে তা অনেকের সহ্য হয় না। কিন্তু সময় বদলেছে।”
এ বিষয়ে বিউটি রাণী পাল বলেন, “এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। একজন শিক্ষক হওয়ার আগে আমি একজন মানুষ, একজন নারী। আমারও অনুভূতি আছে, ভালো লাগা আছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতাকে সম্মান করা উচিত।”
উল্লেখ্য, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল এর আগে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ঘটনার পর থেকে একই গান ব্যবহার করে প্রকাশিত হাজারো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৮৭ সালে গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবু রচিত ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি এবার নতুন এক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের সংহতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।