দক্ষিণ পূর্ব

সুসময়ে বিএনপি: ত্যাগীদের মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক পুনর্জাগরণের এখনই সময়

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬
পঠিত : ৪২
সুসময়ে বিএনপি: ত্যাগীদের মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক পুনর্জাগরণের এখনই সময়

মোঃ মঈনুল আলম ছোটন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত সংগ্রাম, ত্যাগ ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপির নেতাকর্মীরা অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।


দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, হামলা-মামলা, কারাবরণ, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেও বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী দল ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে রাজপথে থেকেছেন। অনেক নেতাকর্মী ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, বছরের পর বছর মামলা মোকাবিলা করেছেন। কেউ কেউ স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাঁদের ত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজকের এই রাজনৈতিক সুসময় এসেছে - এ কথা কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না।


আজ বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এটি নিঃসন্দেহে দলের নেতাকর্মীদের জন্য আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। কিন্তু ক্ষমতার এই সুসময়ই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক পরীক্ষার সময়ও বটে।


রাজনীতির একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো - কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকলে সংগঠনকে শক্তিশালী করার তাগিদ অনেক বেশি থাকে। নেতাকর্মীদের মাঠে সক্রিয় রাখতে হয়, সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে উঠতে হয় এবং তৃণমূলকে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। কিন্তু দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তখন অনেক সময় ক্ষমতার ব্যস্ততা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কারণে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এই জায়গাটিতেই বিএনপিকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।


ক্ষমতার সময় সবচেয়ে বড় বিপদ হলো - দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের আড়ালে চলে যাওয়া এবং সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী ও হাইব্রিডদের সামনে চলে আসা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে অনেক নতুন মুখ হঠাৎ করে দলের চারপাশে ভিড় করেন। অর্থবিত্তের প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার সক্ষমতার কারণে কেউ কেউ সাংগঠনিক যোগ্যতা ও ত্যাগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দলের একশ্রেণির স্বার্থান্ধ দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজেদের সুবিধার জন্য এসব সুবিধাবাদী ব্যক্তিকে প্রশ্রয় দেন। এ প্রবণতা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়।


বিএনপির নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে - দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাঁরাই দলের প্রকৃত শক্তি। যারা মামলা-হামলা মাথায় নিয়ে সংগঠনের পতাকা বহন করেছেন, যারা কারাগারে গেছেন, যারা নির্যাতিত হয়েছেন, যারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও দল ত্যাগ করেননি- তাঁদের মূল্যায়ন করাই হবে দলের প্রতি ন্যায়বিচার।


আজকের সুসময় তাঁদের ত্যাগের ফসল। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যদি কেবল অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা ক্ষমতার নৈকট্যকে সাংগঠনিক যোগ্যতার মাপকাঠি বানানো হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ - সরকার ও দলকে সাংগঠনিকভাবে আলাদা ধারায় পরিচালনা করা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব একটি বিষয়, আর রাজনৈতিক দল পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সরকারকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে; একই সঙ্গে দলকে তার নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক আদর্শ, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কর্মীদের রাজনৈতিক বিকাশের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় যেন দলীয় সংগঠন অবহেলিত না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বিশেষ নজর দিতে হবে।


এখন প্রয়োজন বিএনপির প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটকে নতুন করে সক্রিয় করা। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, থানা, জেলা ও মহানগর - প্রতিটি পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম চালু করতে হবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সংগঠনের কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কোথায় নেতৃত্বের সংকট রয়েছে, কোথায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে - তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাংগঠনিক নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ত্যাগ, সততা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ভূমিকা - এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেবল অর্থবিত্ত, পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা কিংবা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে যোগ্যতার মাপকাঠি করা যাবে না।


যারা দীর্ঘ দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে কাজে লাগাতে হবে। তরুণ ও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার পাশাপাশি পরীক্ষিত প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্যম - এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি শক্তিশালী ও আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠতে পারে।


বিএনপি আজ যে অবস্থানে এসেছে, তা একদিনে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং সর্বোপরি লাখো নেতাকর্মীর ত্যাগ, শ্রম ও আত্মত্যাগ।


তাই আজকের সুসময় যেন কোনোভাবেই আত্মতুষ্টির সময় না হয়; বরং এটি হোক আত্মবিশ্লেষণ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সময়।


দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন - ক্ষমতার সুবিধাভোগী নয়, দলের দুঃসময়ের পরীক্ষিত সৈনিকদের মূল্যায়ন করুন। সুবিধাবাদী ও হাইব্রিডদের দাপট রুখে দিন। ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন, পরীক্ষিত ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের সমন্বয়ে প্রতিটি ইউনিট পুনর্গঠন করুন। সরকার ও দলকে পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে পরিচালনা করুন।


কারণ, বিএনপির শক্তি শুধু ক্ষমতায় নয়- বিএনপির প্রকৃত শক্তি তার তৃণমূলের লাখো নেতাকর্মী। আর সেই তৃণমূলকে অবহেলা করে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকতে পারে না। সুসময়কে যদি সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তবেই বিএনপির ভবিষ্যৎ আরও সুদৃঢ় হবে। আর এই কাজের প্রথম শর্ত- ত্যাগীদের সম্মান, পরীক্ষিতদের মূল্যায়ন এবং সংগঠনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব।


- মোঃ মঈনুল আলম ছোটন

সাবেক সদস্য (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত)

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি

মন্তব্য (১)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।
মোঃ মঈনুল আলম ছোটন ৫ দিন আগে
ধন্যবাদ - দক্ষিণ পূর্ব
উত্তর দিন
আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।