নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের গুলিতে পা হারানো চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সাইফকে স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, সিএমপির বিশেষ চৌকস একটি দল বায়েজিদের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সাইফুল ইসলামকে তার এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া পাঁচলাইশ মডেল থানার পৃথক অভিযানে তার আরও দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনায় গঠিত বিশেষ টিম গত ১২ জানুয়ারি ঢাকার গুলশান থানাধীন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাইফুল ও তার সহযোগী শিহাব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা পাঁচলাইশ থানাধীন আতুরারডিপো এলাকায় সংঘটিত আলোচিত স্বর্ণের বার দস্যুতার ঘটনায় জড়িত বলে তদন্তে উঠে আসে। গ্রেপ্তারের পর আসামিদের নিয়ে অভিযান চালিয়ে মামলার ঘটনায় ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানার মামলা নম্বর–০১ (তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০২৬), দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারায় তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, সাইফুলের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, দস্যুতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ, প্রতারণা এবং মারামারি ও জখমসহ মোট ৩৪টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৭টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তার সহযোগী শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধেও দস্যুতা ও প্রতারণাসহ ৬টি মামলা রয়েছে। স্বর্ণের বার লুটের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৯টি স্বর্ণের বার (২৯০ ভরি) এবং ঘটনায় ব্যবহৃত ২টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে পাঁচলাইশ মডেল থানার বিশেষ অভিযানে গত ১৩ জানুয়ারি হিলভিউ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাইফুলের আরও দুই সহযোগী—মো. রিয়াদ হোসেন (২৮) ও মো. মীর হোসেন ওরফে লিংকন (৩১)–কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইফুলের নেতৃত্বে এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র প্রদর্শন করে চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। গ্রেপ্তার রিয়াদ হোসেনের বিরুদ্ধে চুরি ও দস্যুতাসহ ৫টি এবং লিংকনের বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, দস্যুতা ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ ৫টি মামলা রয়েছে।
সাইফুল ইসলাম সাইফ এর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাইফুলের পায়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল। কিন্তু তাকে ঢাকা থেকে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা ছিল।
সাইফুলের ছোট ভাই শাহিন জানান, ১৫/২০ দিন আগে বাথরুমে পড়ে আহত হয় সাইফুল। চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। কয়দিন ধরে আমার ভাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। আমাদের বারবার বলছিলো তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে। সাইফুল রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করেন তার ছোট ভাই শাহীন।
উল্লেখ্য, গত ২০২১ সালের জুনে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন মহানগর ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। এতে কেটে ফেলা হয় তার একটি পা। এই ঘটনার সাইফুলের মা বাদী হয়ে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সাইফুলকে আটক করে ওসি কামরুজ্জামান ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দেয়ায় ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে তার পায়ে গুলি করেন ওসি।
মামলায় বায়েজিদ থানার তৎকালীন ওসি কামরুজ্জামান ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- বায়েজিদ থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মেহের অসীম দাশ, মো. সাইফুল ইসলাম, এএসআই মো. রবিউল হোসেন, এসআই কেএম নজিবুল ইসলাম তানভীর, এসআই নুর নবী ও বায়েজিদের আমিন জুট মিল এলাকার বাসিন্দা মো. শাহজাহান ওরফে আকাশ।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৬ই জুন রাতে পুলিশের সোর্স আকাশ ফোন করে নগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামকে জরুরি কাজে অক্সিজেন এলাকার হোটেল জামানে দেখা করতে বলেন। সাইফুল সেখানে যাওয়ার পরেই বায়েজিদ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানসহ পুলিশের সদস্যরা তাকে প্রাইভেট কারে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ সময় সাইফুলের মোবাইল ও মোটরসাইকেলের চাবি ছিনিয়ে নেয় তারা। পরে রাত ১টার দিকে বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় নিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
এজাহার সূত্রে আরও জানা গেছে, সাইফুল চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ওসি কামরুজ্জামান তার পায়ে গুলি করেন। এ সময় এসআই মেহের অসীম দাশও গুলি করেন সাইফুলের পায়ে। পায়ে রক্তক্ষরণ হতে হতে জ্ঞান হারান সাইফ। পরে তার জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারেন বাম পায়ে ব্যান্ডেজ এবং চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি আছেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে সাইফুলকে ঢাকা জাতীয় পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার পা কেটে ফেলা হয়। পরে সাইফুলের কাছ থেকে অস্ত্র পাওয়া গেছে বলে মিথ্যা মামলায় চালান দেওয়া হয়।
ওই সময় এই ঘটনায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
এমএইচএফ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।