দক্ষিণ পূর্ব

হালদায় পরিবেশ বিপর্যয়, ধ্বংসের মুখে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ৮ নভেম্বর ২০২৬ ১০:২৪ দুপুর
পঠিত : ২৭
হালদায় পরিবেশ বিপর্যয়, ধ্বংসের মুখে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র
Degchibarictg



দক্ষিণ এশিয়ার রুইজাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদী ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়েছে। নদীর জীববৈচিত্র্য, পানির গুণগত মান ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। এর ফলে ধ্বংসের মুখে রয়েছে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন প্রক্রিয়া।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীনের তত্ত্বাবধানে এবং অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুকের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।

গবেষণায় নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিদেশি প্রজাতির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার স্থানীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে। উজানে লবণাক্ততার প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এতে ৫৭টি দূষণের উৎসেরও তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, হালদা নদী ও এর দুই তীরের ৮১ কিলোমিটার এলাকায় মোট ১ হাজার ২৯টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি এ এলাকায় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে ২১২ প্রজাতির বৃক্ষ, ১৩৩ প্রজাতির গুল্ম, ১৩৩ প্রজাতির লতা, ৫২২ প্রজাতির বীরুৎ, ৩৫ প্রজাতির ফার্ন, ১৩ প্রজাতির মসগোত্রীয় উদ্ভিদ, ৯ প্রজাতির পরজীবী উদ্ভিদ এবং ৭ প্রজাতির ছত্রাক।

উদ্ভিদবৈচিত্র্যের পাশাপাশি ঔষধি উদ্ভিদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার হালদা অববাহিকা। গবেষণায় শনাক্ত মোট উদ্ভিদ প্রজাতির ৫১ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ ৫১৭টি প্রজাতির ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বিদেশি উদ্ভিদের বিস্তার। গবেষণায় শনাক্ত উদ্ভিদগুলোর মধ্যে ৭৬৫টি দেশীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি উদ্ভিদ।

গবেষণায় ২৩টি উদ্ভিদ প্রজাতিকে মারাত্মক বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল ও পাখা ঢেকিয়া। দ্রুত সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ না করলে অনেক দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতি হালদা অববাহিকা থেকে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় হালদা নদী ও এর আশপাশের এলাকায় পরিবেশদূষণের ৫৭টি প্রধান উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি উৎস সরাসরি নদীর পানিদূষণের জন্য দায়ী। এসব উৎসের ১৩টিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি হাটবাজারের আবর্জনা এবং পৌর এলাকার ড্রেনেজ নালার বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশে পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। এ ছাড়া অববাহিকার ১১টি স্থানে মারাত্মক মাটিদূষণ এবং ১০টি স্থানে বায়ুদূষণের উৎস শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় পাওয়া একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো হালদার উজানে উপকূলীয় উদ্ভিদ কেওড়াগাছের উপস্থিতি। গবেষকদের মতে, উজানে কেওড়াগাছের বিস্তার নদীর ওই অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করে। নোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়তে থাকলে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউশসহ বিভিন্ন কার্পজাতীয় মাছের প্রজনন পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে নানা মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডেও হালদার পরিবেশ বিপর্যয় তীব্র হচ্ছে। নদীর বিভিন্ন বাঁকে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভৌত পরিবেশে পরিবর্তন ঘটছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক গতিপথ এবং মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ, রাবার ড্যাম ও স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মা মাছের অবাধ চলাচল ও প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে দ্রুতগতির ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচলও হালদার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি। বিশেষ করে বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন ও প্রজননক্ষম মা মাছ নৌযানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে অতিবৃষ্টি, খরা ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন মাছের ডিম ছাড়ার স্বাভাবিক সময় ও প্রজননচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, নদীদূষণের জন্য চিহ্নিত ২৯টি সরাসরি দূষণের উৎসের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্রুত এসব ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে এই নদী।

ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীনের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে, যা মাছের আবাসস্থল নষ্ট করে দিচ্ছে। মা মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, গবেষণা প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে অবহেলা করা হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য দিন দিন আরও হুমকির মুখে পড়বে।


এসআই/

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।