দক্ষিণ পূর্ব

সুফিয়ান-ফজলুল হকের লড়াই হবে সমানে সমান

Masud forhan
প্রকাশ : ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পঠিত :
সুফিয়ান-ফজলুল হকের লড়াই হবে সমানে সমান

আবু সুফিয়ান ও ডা. একেএম ফজলুল হক

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনটি ভিআইপি হিসাবে পরিচিত। কারণ, এ আসন থেকে যে দলের প্রার্থী ভোটে জয়ী হন, সেই দলই সরকার গঠন করে। আবার সেই সংসদ-সদস্য সরকারের মন্ত্রিসভায়ও স্থান পান। ১৯৯১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত প্রায় সবকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ চিত্রই স্পষ্ট হয়েছে। তাই এই আসনের ভোটের ফল শুধু চট্টগ্রামের নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও কৌতূহল জাগায়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। জয়ের জন্য দিনরাত মাঠ-ঘাট, অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। অন্যান্য আসনের মতো চট্টগ্রামের এ আসনটিতেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটারের বিবেচনায় আছেন বিএনপি মনোনীত আবু সুফিয়ান এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ডা. একেএম ফজলুল হক। মূল লড়াইয়ের আগে ভোটারের সমর্থন আদায়ের লড়াইয়ে উভয় প্রার্থীই যেন সমানে-সমান! গণসংযোগ, প্রচার-প্রচারণায় কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন, উভয়ের প্রাণান্ত চেষ্টা নজরে পড়ছে যে কারও।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় আছেন মোট ১০ জন। এদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া প্রচারে ঘাম ঝরাচ্ছেন কাঁচি মার্কায় বাসদের (মার্কসবাদী) প্রার্থী শফি ‍উদ্দিন কবির আবিদ ও চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্টের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ। গণসংযোগ, মিছিল-পথসভার মধ্য দিয়ে এই দুই প্রার্থীও ভোটারদের আলোচনায় এসেছেন। প্রার্থীদের মধ্যে আরও আছেন- নাগরিক ঐক্যের নুরুল আবছার মজুমদার, গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ হাসান মারুফ, জনতার দলের হায়দার আলী চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুস শুক্কুর, জেএসডি’র আবদুল মোমেন চৌধুরী এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন।

নগরীর কোতোয়ালী, চকবাজার এবং বাকলিয়ার মোট ১৪টি ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-৯ আসনের অবস্থান। এর মধ্যে শিক্ষিত-সচেতন নাগরিকদের আধিক্য আছে কোতোয়ালী-চকবাজার অংশে আর বাকলিয়ায় আছেন শ্রমজীবী ও ভাসমান মানুষের আধিক্য। আবার আসনটিতে সংখ্যালঘু আছেন মোট ভোটারের অন্তত ৩৫ শতাংশ। প্রায় সমসংখ্যক শ্রমজীবী-ভাসমান মানুষ আছে বাকলিয়ায়। এ আসনে মোট ভোটার সোয়া ৪ লাখের মতো। এর মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি সংখ্যালঘু ভোটার বলে ধরা হয়। বাকলিয়ায় আছে সোয়া লাখের মতো ভোটার।

চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই এই আসনের ভেতরে। চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আছে এখানে। ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভালো ফলের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। এটিও এ আসনেরই অংশ। কলেজিয়েট স্কুলও পড়েছে এই আসনে।

স্বাস্থ্যসেবার বড় ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতালসহ বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগনির্ণয়কেন্দ্রও রয়েছে এই আসনে। সংস্কৃতির দিক থেকেও এই আসন আলাদা। শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, থিয়েটার ইনস্টিটিউট, মুসলিম হল; চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখানেই অবস্থিত।

চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ বলা হয় সিআরবিকে। এটিও অবস্থিত চট্টগ্রাম-৯ আসনে। এই এলাকায় ঢুকলেই শহরের কোলাহল থেকে যেন একটু মুক্তি মেলে। চারদিকে সবুজ গাছপালা, বড় বড় শিরীষ, প্রশস্ত সড়ক; মনটা শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু সিআরবিকে ঘিরে নানা সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প, স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। ভোটারদের বড় অংশ চান, যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি এই সবুজ এলাকাটিকে রক্ষা করবেন।

চট্টগ্রামের অর্থনীতির কথা বলতে গেলে খাতুনগঞ্জের নাম আগে আসে। দেশের বড় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি খাতুনগঞ্জ এই আসনের মধ্যেই পড়েছে। ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজারের পাশাপাশি নিউমার্কেট, রেয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, হকার্স মার্কেট—শহরের পরিচিত কেনাকাটার বড় বড় কেন্দ্রও এই আসনে। এখানেই আছে ফিশারিঘাটের বড় মাছের আড়ত, ফলমন্ডির ফলের আড়ত।

১৯৯১ সাল থেকে বিগত ৭টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ব্যতীত) এই আসনের নির্বাচনি ফলাফল এবং সরকার গঠনের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান। ওই সময় সরকার গঠন করে বিএনপি। আবদুল্লাহ আল নোমান ওই সরকারের মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালে আবদুল্লাহ আল নোমানকে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ মান্নান। ওই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং এমএ মান্নান সরকারের শ্রমমন্ত্রী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার এমএ মান্নানকে হারিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন বিএনপির নোমান। বর্তমানে এ দুই নেতা প্রয়াত। ২০০৮ সালে এই আসনে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয় বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসিকে। বিপরীতে ধানের শীষের মনোনয়ন পান বিএনপির শামসুল আলম। খাতুনগঞ্জের বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান শিল্পপতি শামসুল আলমকে হারিয়ে নুরুল ইসলাম বিএসসি এ আসনে জয়লাভ করেন। আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে। ভিআইপি এই আসন থেকে ভিআইপি প্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করার পর সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় নুরুল ইসলাম বিএসসিকে। এরপর আরও তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও এসব নির্বাচন ছিল বিতর্কিত। দিনের ভোট রাতে নিয়ে, ভোটারবিহীন এবং ‘আমি আর ডামি’ প্রার্থীর তিনটি নির্বাচনে দেখা গেছে, কোতোয়ালি আসন থেকে ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু সংসদ-সদস্য হন।

২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয় প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে। তার বিপরীতে বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু তাকে হারিয়ে দেওয়া হয় কেন্দ্র দখল করে। ২০২৪ সালেও নওফেল মনোনয়ন পান আওয়ামী লীগের। এই মেয়াদে ‘আমি আর ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচনে নওফেল ছিলেন ‘জয়ী।’ এ দুই মেয়াদের প্রথম মেয়াদে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, দ্বিতীয় মেয়াদে শিক্ষামন্ত্রীর পদ লাভ করেন নওফেল। কোতোয়ালি আসনে নির্বাচনে প্রার্থীর জয়ের বড় নিয়ামক হচ্ছে বাকলিয়ার ভোট। এ এলাকার ভোট যে প্রার্থীর বাক্সে যায়, সেই প্রার্থীই জয়লাভ করেন।

রাজনীতি সচেতন বাসিন্দাদের মতে, বাকলিয়া বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তবে জামায়াতের সমর্থকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। এবারের প্রেক্ষাপটে বাকলিয়ার ভোট দুই ভাগে ভাগ হবে। সেক্ষেত্রে ভোটে জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হবে সংখ্যালঘুরা। এ বাস্তবতা মাথায় রেখে ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দুজনই সংখ্যালঘুদের কাছে টানার চেষ্টায় যেমন আছেন, তেমনি চষে বেড়াচ্ছেন বাকলিয়ায়ও।

বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান একেবারে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতা। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সামনের কাতারে আছেন। দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদেও ছিলেন। তিনি মূলত নগরীর চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা, যেটি চট্টগ্রাম-৮ আসনের মধ্যে পড়েছে। ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের আমলে তিনি দুই দফায় সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি এবার তাকে ওই আসন থেকে সরিয়ে এনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়ন দিয়েছে।

আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও বিএনপির দলীয় কার্যালয় ঘিরে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরব সুফিয়ান অবশ্য এ আসনের ভোটারদের মধ্যেও পরিচিত মুখ। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করকে পাশে পাওয়ায় নির্বাচনের মাঠে বাড়তি জোর পাচ্ছেন সুফিয়ান।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী একেএম ফজলুল হক চিকিৎসক হিসেবে চট্টগ্রামে পরিচিত মুখ। পারিবারিকভাবেও তার ভালো পরিচিতি আছে। এলাকায় সজ্জন মানুষ হিসেবেই তাকে লোকজন চেনে। রাজনীতির মাঠে অত বেশি পরিচিত না হলেও সমাজসেবার কারণে তার আলাদা একটি ভাবমূর্তি আছে। তবে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতায় প্রথম দফায় তার মনোনয়ন বাতিল হলে তিনি কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। পরে অবশ্য প্রার্থিতা ফেরত নিয়ে এসে মাঠে নেমে গেছেন জোরশোরে।

আবু সুফিয়ান বলেন, আমাদের রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব আছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সেটা অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে নানা সমস্যা আছে। তারমধ্যে জলাবদ্ধতা। এটা সমাধানে জোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাকলিয়ার অনেক এলাকা অনুন্নত রয়ে গেছে। সেখানে মানুষের নানা অভিযোগ আছে। আমি সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করব। আমাদের রাজনীতি জনগণের কল্যাণের জন্য। আমরা প্রতিহিংসা নয়, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে সকল মত ও পথের মানুষকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। আমাদের আদর্শ ভিন্ন হতে পারে, মতের অমিল থাকতে পারে কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এক ও অভিন্ন। তাহলেই আমরা জনগণের আকাঙ্খিত সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।

ফজলুল হক বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায়  এলে এলাকায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি থাকবে না। সাধারণ মানুষ যাতে কোনো হয়রানি ও ভোগান্তি ছাড়াই নিজ নিজ কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া হবে। বাকলিয়াকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, মাদক ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। আমি নির্বাচিত হতে না পারলেও বাকলিয়ায় ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল করে দিবো। জীবনমানোন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশ্বাস দেন তিনি।

ইই

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।