ফটিকছড়ি প্রতিনিধি
এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে মা মাছ নিধন কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। গত দুই মাসে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ একাধিক বড় ও ছোট অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ ও ধ্বংস করলেও, অভিযান শেষ হলেই রাতের আঁধারে আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে সংঘবদ্ধ অসাধু চক্র।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ৭ জানুয়ারি হালদা নদীর নাজিরহাট ব্রিজ এলাকা থেকে সমিতিরহাট ইউনিয়ন পর্যন্ত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন ফটিকছড়ি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আজিজুল ইসলাম। এ সময় সমিতিরহাট পূর্ব ধলই এলাকা থেকে আনুমানিক ২৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি কারেন্ট জাল ও ৫৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি চরঘেরা জাল উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে নাজিরহাট অংশ থেকে ৯টি হাত বরশি ও ৩টি বোতল বরশি জব্দ করা হয়।
এর আগে ১৮ ডিসেম্বর পরিচালিত আরেকটি বড় অভিযানে নদীতে অবৈধভাবে পাতা দুটি চরঘেরা জাল জব্দ করা হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিটার। পাশাপাশি মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ১৮টি বড়শিও উদ্ধার করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, জব্দকৃত এসব জাল ও সরঞ্জামের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ৮০ হাজার টাকারও বেশি।
এদিকে গত ২৫ ডিসেম্বর মঙ্গলবার হাটহাজারী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহেদ আরমানের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি অভিযানে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা আইন অমান্য করার দায়ে ৬ জনকে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং মোট ৬ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। ওই আদালতে প্রসিকিউশন করেন হাটহাজারী সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শওকত আলী এবং সহযোগিতা করেন হাটহাজারী মডেল থানার পুলিশ।
সরেজমিনে ৯ জানুয়ারি শুক্রবার দেখা গেছে, হালদা নদীর সূয়াবিলের ব্রাহ্মহাট, নাজিরহাটের কুম্ভারপাড়া, রোসাংগীরির সমিতিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতের অন্ধকারে মাছ শিকারের চিহ্ন ও একাধিক আলামত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শেষ হলেই সংঘবদ্ধ চক্র আবার আগের মতো সক্রিয় হয়ে পড়ে।নাজিরহাট সূয়াবিল ও কাজিরহাট এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, কিছু অসাধু ব্যক্তি আধুনিক জাল ও বিভিন্ন ধরনের বরশি ব্যবহার করে নির্বিচারে মা মাছ নিধনে লিপ্ত রয়েছে, যা হালদা নদীর প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, “হালদা নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ অবৈধ। এভাবে মা মাছ ধ্বংস হতে থাকলে ডিম ছাড়ার সক্ষম মাছ হারিয়ে যাবে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে হালদার প্রজনন ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
মানবাধিকার সংগঠক অ্যাডভোকেট ইসমাঈল গণি বলেন,“হালদা শুধু একটি নদী নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মা মাছের ভাণ্ডার। এখানে মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধ বন্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর ও ধারাবাহিক ভূমিকা নিতে হবে।”
চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং টিম গঠন, নৌ-পেট্রোল জোরদার, রাতভিত্তিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ হবে না।
সচেতন ফটিকছড়িবাসীর দাবি, হালদা নদীতে অবৈধ মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত মনিটরিং টিম গঠনেরও আহ্বান জানান তারা।
তাদের কণ্ঠে একটাই দাবি,
“হালদার মা মাছ বাঁচাও, প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দাও প্রাণ।”
হালদার মা মাছ রক্ষা করা মানে শুধু একটি নদী নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
ইই
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।