দক্ষিণ পূর্ব

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শেষ হচ্ছে শুক্রবার, শেষ দিনেও সীমাহীন ভোগান্তি

mainulislam
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৫
পঠিত :
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শেষ হচ্ছে শুক্রবার, শেষ দিনেও সীমাহীন ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক:


চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি আগামীকাল শুক্রবার সকাল আটটায় শেষ হচ্ছে। তবে শেষদিনেও সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে রোগী ও স্বজনদের। এদিন বহু মানুষ চিকিৎসা ছাড়াই হাসপাতাল ছেড়েছে। অনেকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারেননি। কেউ কেউ সকালে সেবা নিতে এসে ফিরেছেন দুপুরে। আবার অনেক গুরুতর রোগীও এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে অন্যত্র গেছেন চিকিৎসা নিতে। 


বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগ ও বর্হিবিভাগের চিত্র ছিল এমনই। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্হিবিভাগে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। প্রত্যেক কক্ষে ২ জন করে চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন ১ জন করে। এছাড়াও রোজার দিন হওয়ায় অনেকেই ছুটিতে আছেন। রোগীরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারছেন না। একই চিত্র জরুরী বিভাগেও। ডাক্তার নেই তাই মিলছে না টিকিটও। এদিন বেশ কয়েকজনকে জরুরী বিভাগে কর্মরতদের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়াতে দেখা গেছে। তবে কর্মীরা বলছেন, তাদেরকে দেখে দেখে টিকিট দিতে বলা হয়েছে। এছাড়াও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা যেহেতু আন্দোলনে সেহেতু টিকিট দিয়ে চাপ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই এমন নির্দেশনাও তাদের কাছে ছিল বলে জানা গেছে। 


ফটিকছড়ি থেকে আসা ৬০ বছরের মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি। তার ছেলে কামরুল আলম বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে আমার বাবা চোখে সমস্যা হচ্ছে। তিনি সবকিছু ঝাপসা দেখছেন। এছাড়াও চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। আবার বাবার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাও আছে। আজ সকালে চেকআপের জন্য এনেছি চমেকে। কিন্তু দুপুর হয়ে গেলেও কোনো ডাক্তার নেই। 


বৃহস্পতিবার অন্তত কয়েক হাজার রোগীর একই দশা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা চিকিৎসা পেলেও, বহির্বিভাগে আসা অসংখ্য মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ভুগছেন বয়স্ক ও জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীরা।

জানা গেছে, টানা কয়েকদিন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে চালাচ্ছেন। এতে চমেক হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। 


তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার (১৪ মার্চ) সকাল ৮টা পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে। এরপর তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। শুক্রবার থেকে তারা পুর্নদমে কাজে ফিরবেন।


ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এই আন্দোলনের কারণে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর সেবা এবং বৈকালিক সেবাও বন্ধ আছে। যদিও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের  আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ, এডমিশন ইউনিট এবং লেবার ওয়ার্ড চালু ছিল। যাতে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে থাকলেও রেগুলার চিকিৎসক আছেন তারাই সেবা দিচ্ছেন। এতে খুব বেশি প্রভাব পড়ছে না। 


যদিও দিনভর সেই কথার উল্টো চিত্রই দেখা গেছে হাসপাতালে। এদিন চমেক হাসপাতালের ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বাঁশখালীর হাসিনা বেগম নামে একজনকে কাঁদতে দেখা যায়। তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নিয়মিত চিকিৎসা করাচ্ছেন চমেক হাসপাতাল থেকে। গতকাল (বুধবার) থেকেই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন এই নারী। তাই বৃহস্পতিবার এসেছেন চেকআপ করাতে। কিন্তুু এসেই দেখেন  হাসপাতালে কোনো ডাক্তার নেই। কেউ রোগী দেখছেন  না। নার্সরা বললছেন, কেস সিরিয়াস হলে জরুরি বিভাগে যেতে। কিন্তু হাসিনা বেগম নিয়মিত চিকিৎসা চাচ্ছেন। বহু কষ্টে ডাক্তার দেখানোর কথা বলেন, আরেক প্রসূতির স্বজন। 


কর্মবিরতিতে থাকা এক ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, তারা ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। যার মধ্যে গতকাল (বুধবার) ১টি দফা পূরণ হয়েছে। কিন্তু বাকি যে ৪ দফা সেগুলো পূরণের দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তারা এখনো সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা পাননি। সাধারণ মানুষ কষ্ট পাক এটা তারাও চান না।  

মাসুম আহমেদ নামে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, এই কর্মবিরতি আমাদের নিজেদের জন্য নয়, চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষার জন্য। আমরা ২৪ ঘন্টার জন্য কর্মবিরতি পালন করছি। আগামীকাল (শুক্রবার) ৮টার পর থেকে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। 

এ বিষয়ে চমেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের জরুরি পরিষেবা চালু আছে। তবে বহির্বিভাগ সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে, এটা সত্যি। আমরা চেষ্টা করছি যাতে রোগীদের অসুবিধা না হয়। যাদের সিরিয়াস ছিল তাদের আমরা জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিয়েছি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) ডিগ্রিধারী সাব এসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারদের (স্যাকমো) কয়েকজন বাংলাদেশ মেডিকেল এণ্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইনের কয়েকটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে ডাক্তার পদবী ব্যবহারের অনুমতির জন্য হাইকোর্টে রিট করেন। ৬৭ বার রিটটি কজ লিষ্টে আসলেও কোন শুনানি হয়নি। নানা জটিলতার পর ২০২৪ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি রিটের ৯১ তম শুনানী হয়। যাতে গতকাল বুধবার রায়ের দিন ধার্য্য ছিল। 

ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জনসাধারণকে অপচিকিৎসার হাত থেকে রক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও চিকিৎসক পেশার মানমর্যাদা রক্ষায় ৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন করা জরুরী।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।