দক্ষিণ পূর্ব

বিপুল বিনিয়োগেও ইঞ্জিন ক্রয়ে অনাগ্রহ, বাড়ছে দুর্ভোগ

মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫
পঠিত :
বিপুল বিনিয়োগেও ইঞ্জিন ক্রয়ে অনাগ্রহ, বাড়ছে দুর্ভোগ
মাসুমুল ইসলাম 

দেড় দশকে রেল খাতে সরকারের বিনিয়োগ ছুঁয়েছে প্রায় লক্ষাধিক কোটি টাকা। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় টেকসই অবকাঠামো গড়তে রেলকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ-ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) সংগ্রহে রয়েছে অদ্ভুত অনাগ্রহ। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলে রেল চলাচল কার্যত ধীরগতি ও সংকটের আবর্তে আটকে পড়েছে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে একসময় ১৭৯টি মিটারগেজ ইঞ্জিন থাকলেও বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৩১টিতে। এর মধ্যে প্রতিদিন চালানোর মতো ‘ফিট’ ইঞ্জিন থাকে সর্বোচ্চ ৭৮টি, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১১৯টি। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ৪০টির বেশি ইঞ্জিন ঘাটতি নিয়েই সার্ভিস চালাতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রেনের শিডিউল, যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহন-সবখানেই। এক ট্রেন গন্তব্যে না পৌঁছালে আরেকটি যাত্রা শুরু করতে পারছে না। অধিকাংশ দিন কোনো না কোনো ইঞ্জিন পথে বিকল হচ্ছে। এই ‘ইঞ্জিন জট’ ধীরে ধীরে রেলের সামগ্রিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। করোনাকালের পর পূর্বাঞ্চলে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক মেইল ও লোকাল ট্রেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইঞ্জিন সংকট মোকাবেলায় ট্রেন সংখ্যা কমিয়ে সার্ভিস টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে কমেছে যাত্রীসেবা, আর বেড়েছে যাত্রীদের দুর্ভোগ। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের জন্য প্রতিদিন দরকার ১৯টি ইঞ্জিন, কিন্তু রেল দিতে পারছে মাত্র ৪-৫টি। এতে কনটেইনার জট তৈরি হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়ে। 

জানা গেছে, পূর্বে ৭০টি ইঞ্জিন আমদানির একটি প্রকল্প অর্থায়ন জটিলতায় বাতিল হয়ে গেছে। অন্যদিকে ডুয়েলগেজ রূপান্তর প্রকল্পে মাত্র ৩০টি ইঞ্জিন আনার পরিকল্পনা আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। রেলের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, একটি ইঞ্জিন আমদানিতে সময় লাগে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ বছর। অথচ রেল কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতের চাহিদা নিরূপণ না করে শুধু বর্তমান সংকট মেটাতেই ব্যস্ত। এতে করে কিছু সমস্যা সাময়িকভাবে মেটানো গেলেও নতুন করে আরও বড় সংকট তৈরি হচ্ছে।

রেলের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিন আমদানি না করে যন্ত্রাংশ আমদানির পেছনে আগ্রহ বেশি, কারণ এতে প্রকৌশল বিভাগের নির্দিষ্ট একটি মহল এবং ঠিকাদাররা বিপুল আর্থিক সুবিধা পান। দরপত্রের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কেনা হলেও এর দায় পড়ে রেলের সার্বিক সেবার ওপর। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সরকার যন্ত্রাংশ আমদানির বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভবিষ্যতের চাহিদা ও পরিকল্পনায় ঘাটতি রেখে চলার কারণে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে রেলওয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট মোকাবিলা করতে পারে-এমন আশঙ্কা করছেন রেল সংশ্লিষ্টরা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেল কর্মকর্তারা বলছেন, ইঞ্জিন সংকট না থাকলে বিদ্যমান কোচ ও রেলপথ দিয়েই মানসম্পন্ন ট্রেন চলাচল সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ হলেও ইঞ্জিন ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সংগ্রহে রেলওয়ের আগ্রহ নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগের সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। সংকটের কেন্দ্রে ইঞ্জিনের মারাত্মক ঘাটতি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ইঞ্জিন আমদানিতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিলে রেলওয়ে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। আশা করছি ধাপে ধাপে সংকট কমবে।

এমএইচএফ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।