মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন:
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ এখন কার্যত নেতৃত্বহীন। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় সংগঠনটির সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে বহু আগে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকেই রয়েছেন অসহায় অবস্থায়। একে অন্যের খোঁজ নেওয়ার মতো সাংগঠনিক তৎপরতাও নেই। লোক দেখানো মিছিল করে এবং তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই অনেকের রাজনৈতিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ব্যস্ত মামলা সামলাতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংগঠনটির পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। তবে এর মধ্যেও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নগরের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করে আলোচনায় আসছেন।
সম্প্রতি নগরের জিইসি মোড় ও দুই নম্বর গেট এলাকায় বড় পরিসরে ঝটিকা মিছিল করেছে এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ। মিছিলে নেতৃত্ব দেন কলেজ ছাত্রলীগের জিএস এবং মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত আরশেদুল আলম বাচ্চুর অনুসারীরা। মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপের আরেক নেতা ও নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির অনুসারীদেরও কয়েক দফা ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া আজম নাসির বলয়ের সাইফুল আলম লিমনের নেতৃত্বেও নগরের বিভিন্ন স্থানে মিছিলের ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও থেমে নেই এ ধরনের তৎপরতা। শহীদ মিনার, এক নম্বর সড়ক ও শাটল ট্রেনে ভোরে ঝটিকা মিছিল করতে দেখা গেছে ছাত্রলীগ নেতা সাজিদ মোস্তফা আশফি, আবরার শাহরিয়ার ও ওয়াহিদের গ্রুপের কয়েকজন নেতাকর্মীকে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনেকে চাকরি ও ব্যবসা হারিয়েছেন। একসময়কার প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতাদের কেউ কেউ এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলেও জানা গেছে। অনেকে বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
নগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বছরের পর বছর আগে। এরপরও নতুন কমিটি গঠিত হয়নি। ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে সাংগঠনিক ঐক্য নেই। পুরোনো গ্রুপিংও পুরোপুরি শেষ হয়নি। আওয়ামী লীগের বনেদি পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের যোগাযোগ নেই বললেই চলে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দলটি যেভাবে ‘হাইব্রিড’ নেতাকর্মীদের দখলে চলে গিয়েছিল, এখনো সেই ধারার পরিবর্তন হয়নি। দলের জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সক্রিয় ও নিবেদিত পেশাজীবীদের অনেকেই নেতৃত্বে জায়গা পাননি। এ নিয়ে পেশাজীবীদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে।
সংগঠনের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রধান বলয় সক্রিয় ছিল বলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এর একটি ছিল বাকশালপন্থি হিসেবে পরিচিত একটি বড় গ্রুপ। মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদ-পদবিতে এই বলয়ের নেতাকর্মীদের প্রভাব ছিল। সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারকে ঘিরে তৃণমূলের একটি অংশ এখনো গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার প্রভাবকে কেন্দ্র করে প্রবীণ ও পেশাজীবী নেতাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, মহিউদ্দিন চৌধুরীর বলয়ের ওপর নওফেলের প্রভাব তারা মেনে নিয়েছিলেন। তবে বিপ্লব বড়ুয়া কেন্দ্রীয় রাজনীতিক হিসেবে ওই বলয়ে প্রভাব বিস্তার করুন—এটি তারা মেনে নিতে পারেননি। নগর ছাত্রলীগের বড় একটি অংশ নওফেলকে তাদের ‘প্রিয় নেতা’র উত্তরসূরি হিসেবে মানত। তবে নওফেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিপ্লব বড়ুয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
অন্যদিকে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আজম নাসির উদ্দিনের বলয়ে অন্য কোনো নেতার প্রভাব ছিল না বলে নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি। তার বলয়ে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং থাকলেও নেতার কমান্ড সবাই মেনে চলতেন। এ কারণে এই বলয়টি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও বলয়টির নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার পরও বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচি পালিত হলেও সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যকর নেতৃত্ব না থাকায় চট্টগ্রাম নগরে আওয়ামী লীগ কার্যত ছন্নছাড়া অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিনের গ্রুপিং, নেতৃত্বের সংকট এবং মামলা-সংক্রান্ত চাপের কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বড় অংশই এখন রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়।
আর /দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।