দক্ষিণ পূর্ব

চার দিন পর সচল সেন্টমার্টিন রুট, প্রথম দিন গেলেন ৮৩৬ পর্যটক

দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক
দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক
প্রকাশ : ৫ নভেম্বর ২০২৬ ০৪:০১ সকাল
পঠিত : ২৫
চার দিন পর সচল সেন্টমার্টিন রুট, প্রথম দিন গেলেন ৮৩৬ পর্যটক
Degchibarictg


অবশেষে সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে কক্সবাজার থেকে দ্বীপটির উদ্দেশে ছেড়ে গেছে এমভি বারো আউলিয়া। এর মধ্য দিয়ে পর্যটন মৌসুম শুরুর চার দিন পর সচল হলো সেন্টমার্টিনের নৌপথ।


সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। সরকারি অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের সুযোগ চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন, নৌযান চলাচলের ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মতি পাওয়ার পর জাহাজ চলাচলের অনুমতি মেলে।


সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। প্রথম দিন এমভি বারো আউলিয়া যাত্রা করেছে। পর্যায়ক্রমে বাকি দুটি জাহাজও চলাচল শুরু করবে।


তিন জাহাজে ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন

সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমোদন পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলোর সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফে ৭১৬ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।


নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, এমভি বারো আউলিয়া সকাল ৭টায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে দ্বীপ থেকে ফিরবে বেলা আড়াইটায়। এমভি কর্ণফুলী সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে যাত্রা করে ফিরবে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে। আর এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় দ্বীপ থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবে। সব কটি জাহাজ কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন করবে।


প্রথম দিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন ঢাকার পর্যটক রবিউল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সেন্টমার্টিন আমার খুবই প্রিয়। পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। প্রথম দিনেই যেতে পেরে খুব ভালো লাগছে। যদিও জাহাজ ছাড়তে কিছুটা দেরি হয়েছে।’


ময়মনসিংহ থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তরিকুল আহমেদ বলেন, ‘তিন দিনের জন্য আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। সাগরের যাত্রা খুব রোমাঞ্চকর। আশা করি নিরাপদে সেখানে পৌঁছাব।’


প্রতিদিন যেতে পারবেন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক

সরকারের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ থাকবে। এ সময় পর্যটকেরা দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি রাত্রিযাপনও করতে পারবেন। তবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন।


পর্যটকদের জন্য এবার কয়েকটি শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।


এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের পরিচয় ও যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।


পর্যটন চালু হলেও পরিবেশ রক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ

পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত করা হলেও দ্বীপের ভঙ্গুর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশ কিছু বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পর্যটকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।


নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ।


পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টমার্টিনের মতো ছোট ও সংবেদনশীল দ্বীপে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির ব্যবহার, জ্বালানি, শব্দদূষণ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই পর্যটক প্রবেশের অনুমতির পাশাপাশি নিয়ম বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।


পর্যটন মৌসুম ঘিরে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা

দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসায় নতুন করে গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। পর্যটক পরিবহনের পাশাপাশি দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।


দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত। পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় তাঁদের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।


স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা এই সময়ের অপেক্ষায় থাকি। পর্যটন মৌসুম সেন্টমার্টিনের মানুষের কাছে আশীর্বাদ। পর্যটকদের ভ্রমণ সুন্দর করতে আমরা সর্বোচ্চ নজর রাখব।’


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় পর্যটনের বাণিজ্যিক প্রসার একসময় দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।


মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।