চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ পরিকল্পনায় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে গড়ে তোলা হবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো। অন্যদিকে, খেজুরতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সবুজ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে এলাকাটিকে গড়ে তোলা হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পর্যটন খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনা তৈরিই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
রোববার (৮ নভেম্বর) খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতে পরিচ্ছন্নতা ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ার কার্যক্রমে এসব পরিকল্পনার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) মহাপরিচালক (সচিব) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতের প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—দুটিই উপভোগ করা যায়। যথাযথ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকাটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যৌথ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিবেশ সংরক্ষণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি পর্যটনও দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে সহায়ক হবে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি পুরো চট্টগ্রাম জেলাকে পরিচ্ছন্নতার অনুকরণীয় মডেল হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, গত জুলাই থেকে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় পতেঙ্গা ও খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পতেঙ্গার ওয়েস্ট পয়েন্ট থেকে খেজুরতলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পুরো সৈকত উন্মুক্ত করতে চাই। এলাকাটিকে নান্দনিকভাবে সাজানো হবে। তবে খেজুরতলার প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।’
জেলা প্রশাসক জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছে। পতেঙ্গা ও খেজুরতলায় আলাদা বৈশিষ্ট্যের পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। পতেঙ্গায় আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি খেজুরতলায় গুরুত্ব পাবে সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
খেজুরতলার পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানকার নির্মল বাতাস, সবুজ প্রকৃতি এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। এ সৈকতকে নতুনভাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে চায় জেলা প্রশাসন।
পর্যটনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি পর্যটন থেকেও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের সমুদ্রসৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তবে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা, সেবার মান এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘অন্যান্য দেশে বিদেশি পর্যটকদের যেভাবে সেবা দেওয়া হয়, আমাদেরও সেই মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।’
এ জন্য প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, গণমাধ্যম ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে পতেঙ্গা ও খেজুরতলার বাইরেও চট্টগ্রামের অন্যান্য সম্ভাবনাময় ও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত পর্যটন এলাকাগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরার পরিকল্পনার কথা জানান।
চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশে পরিচিত করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে জেলা প্রশাসক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে। বিশ্বের মানুষকে জানাতে হবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে চট্টগ্রামে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকায় এবার এক দিন পিছিয়ে রোববার এ কার্যক্রম আয়োজন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি না, চট্টগ্রামকে নান্দনিকভাবে সাজানোর কাজও করছি। আমাদের সন্তানেরা যাতে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য নির্মল আনন্দের জায়গা তৈরি করতে হবে।’
মানুষ প্রকৃতির অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তা উপভোগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য থেকেই খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ উদ্যোগকে পর্যটন উন্নয়নের নতুন যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজকে আমাদের একটি নতুন যাত্রা শুরু হলো। আমরা শুধু পরিচ্ছন্নতা নয়, এই সমুদ্রসৈকতকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তা নিয়েও কাজ করব। বিশ্বের পর্যটকদের এখানে আসার আহ্বান জানাব।’
চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, নান্দনিক ও পর্যটনবান্ধব নগর-জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।