দক্ষিণ পূর্ব

ওটিতে ঢুকেছিলেন সুস্থ, লাশ হয়ে বের হলেন মাইশা

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:০১ দুপুর
পঠিত : ৩২
ওটিতে ঢুকেছিলেন সুস্থ, লাশ হয়ে বের হলেন মাইশা

ছবি সংগৃহীত

কত স্বপ্ন ছিল। নতুন অতিথিকে ঘিরে ছিল পরিবারের কত আয়োজন। গর্ভের সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে সুস্থ শরীরেই অপারেশন থিয়েটারে ঢুকেছিলেন নাজিয়া রহমান মাইশা (৩০)। কিছুক্ষণ পর তাঁর কোল আলো করে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মেয়ের মুখ দেখার পরপরই মাইশার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় তাঁর।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মাইশার স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বমির সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

মাইশা নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা। তিনি বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের সাবেক কর্মচারী প্রয়াত মো. নাজমুর রহমান বাদলের মেয়ে এবং একজন নারী উদ্যোক্তা ছিলেন।

স্বজনেরা জানান, গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেজিস্ট্রার ডা. তহুরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাইশা। তাঁর পরামর্শেই বৃহস্পতিবার দুপুরে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।

বিকেলে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় মাইশার কন্যাসন্তান। পরিবারের জন্য তখন আনন্দের মুহূর্ত। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় উৎকণ্ঠায়। স্বজনদের দাবি, স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর থেকেই মাইশার শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। তিনি বারবার বমি করতে থাকেন।

মাইশার স্বজন সাজ্জাদ হোসেন নয়নের অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক ডা. সোহেল মিয়া স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর অন্য একটি ওটিতে চলে যান। এরপর মাইশার অবস্থার অবনতি হলেও তিনি পাশে ছিলেন না বলে দাবি করেন নয়ন।

একপর্যায়ে স্বজনদের জানানো হয়, মাইশার অবস্থা গুরুতর। তাঁকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান—এমন দাবি করেছেন স্বজনেরা।

মাইশার স্বামী হাফিজ আহমেদের প্রশ্ন,“যে মানুষটা সুস্থভাবে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকল, সে কীভাবে মৃত হয়ে বের হলো?”

স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ জানতে চান তিনি। তাঁর ভাষায়, “যে মানুষটা একটু আগেও আমাদের সঙ্গে ছিল, কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিল—সে কীভাবে এভাবে চলে গেল, আমরা মেনে নিতে পারছি না।”

অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সাহিল আহমেদ সাকিব বলেন, অস্ত্রোপচার সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। মাইশা পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে নবজাতক কন্যার মুখও দেখেছিলেন। পরে হঠাৎ তাঁর রক্তচাপ কমে যায় এবং তিনি তিনবার বমি করেন। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পরও অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শেবাচিম হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বমির সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

তবে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ মাইশার স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর থেকেই মাইশার অবস্থার অবনতি হয়েছিল। চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মাইশা আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর সদ্যোজাত কন্যাশিশুটি এখন মায়ের মুখের অপেক্ষায়—যে মা তাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়ে নিজেই চলে গেলেন অন্ধকারের ওপারে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম। তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।