মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
পাহাড়, সমুদ্র, ঝরনা, বন আর দীর্ঘ উপকূল—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম। পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলে প্রতিবছর ছুটে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারো মানুষ। কিন্তু যে প্রকৃতি ও স্থাপনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে, সেখানেই বাড়ছে দখল, দূষণ, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতা।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সম্ভাবনার তুলনায় ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেকটাই পিছিয়ে। কোথাও সৈকতের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান, কোথাও পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্যে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। আবার কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু, পরিত্যক্ত পড়ে আছে স্থাপনা ও বিনোদনকেন্দ্র। ফলে প্রকৃতির টানে আসা পর্যটকদের অনেককেই ফিরতে হচ্ছে হতাশা নিয়ে।
পতেঙ্গা সৈকতে প্রকৃতির চেয়ে দোকানের আধিক্য
চট্টগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক পর্যটক। তবে সৈকতের সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অস্থায়ী দোকান ও নানা ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সৈকতজুড়ে তিন শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। ওয়াকওয়ে, বসার স্থান ও প্রবেশপথের বিভিন্ন অংশেও বসেছে দোকান। পাশাপাশি রয়েছে নাগরদোলা, বিচ বাইক ও ঘোড়ার রাইড। ফলে অনেক জায়গায় সমুদ্রের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের চেয়ে চোখে পড়ে দোকানপাট ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।
এক দোকানি রেজাউল হক বলেন, দোকান বসানোর অনুমতি নেই। প্রশাসনের অভিযান হলে দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়, পরে আবার বসানো হয়।
পর্যটক শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, অতিরিক্ত দোকানপাটের কারণে সৈকতের আগের পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। টয়লেট ও খাবারের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়।
আরেক পর্যটক শান্তি মির্জার অভিযোগ, সৈকতে প্রায় সবকিছুর দাম বেশি। এসব দেখার মতো কার্যকর তদারকি নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পারকিতে হারিয়ে যাচ্ছে ঝাউবনের সৌন্দর্য
আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিস্তীর্ণ ঝাউবন, লাল কাঁকড়া ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে ঝাউবনের বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
ছুটির দিনে প্রায় কয়েক হাজার দর্শনার্থী এলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। রয়েছে মাত্র দুটি রেস্তোরাঁ ও দুটি পাবলিক শৌচাগার। পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যুৎ সংযোগের সীমাবদ্ধতায় সন্ধ্যার পর অনেকটা অন্ধকারে ডুবে যায় এলাকা। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতিও নেই।
চট্টগ্রাম নগর থেকে আসা পর্যটক জোবায়ের জিহাদ বলেন, পারকির সৌন্দর্যের কথা শুনেই বেড়াতে এসেছিলেন। কিন্তু গিয়ে বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও পাননি।
স্থানীয় দোকানি আব্দুল হাওলাদার বলেন, সারা বছর আগের মতো লাল কাঁকড়া দেখা যায় না। এতে অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে যান।
কল্পলোকেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা কল্পলোক আবাসিক বিচ দিনের বেলায় পর্যটকদের আনাগোনায় সরব থাকলেও সন্ধ্যার পর নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
পর্যটকদের মতে, পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জায়গাটির সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবুজ ও নান্দনিক পরিবেশের সঙ্গে পর্যটনকে সমন্বয় করা গেলে এ খাতের বিকাশ বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
‘মিনি বাংলাদেশ’ এখন ভাঙাচোরা স্মৃতিচিহ্ন
চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের পাশে অবস্থিত ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সও হারিয়েছে তার পুরোনো জৌলুস।
প্রায় ১৬ একর জায়গাজুড়ে ২০০৬ সালে নির্মিত এই কমপ্লেক্সে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শনের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কমপ্লেক্সে ছিল ৭১ মিটার উঁচু ওয়াচ টাওয়ার, জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল, লালবাগ কেল্লা, হাইকোর্ট ও কান্তজিউ মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনার প্রতিরূপ।
প্রতিষ্ঠার পর এটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হলেও দীর্ঘদিনের অযত্ন, তদারকির ঘাটতি ও পরবর্তী সময়ে হামলা-ভাঙচুরে এর অবস্থা এখন জরাজীর্ণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও লোহার সীমানাপ্রাচীর ভাঙা, কোথাও বন্ধ ফটকে ঝুলছে তালা। জীর্ণ টিকিট কাউন্টার, ঝোপঝাড়ে ঢাকা হাঁটার পথ, দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তারা ও ফাটল চোখে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ। ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিরূপগুলোতেও জমেছে শেওলা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সম্প্রতি সেখানে প্রতীকী পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জানিয়েছেন, কমপ্লেক্সটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীন এ পার্ক আগামী দেড় মাসের মধ্যে চালুর বিষয়ে মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। নতুন ইজারাদার নিয়োগের উদ্যোগ চলছে। ইজারাদার স্থাপনাগুলো মেরামত করে পার্ক পরিচালনা করবেন এবং জেলা প্রশাসন এর তদারকি করবে।
দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।